(Ref: Figure ৩.৯)
দুটি প্রতিবেশী গ্রহের রহস্য শিগগিরই ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে পারে। কারণ এমন একটি মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহের একটি চাঁদের অংশ পৃথিবীতে নিয়ে আসবে। একই সঙ্গে আরেকটি মহাকাশযান বুধ গ্রহের কক্ষপথে নামবে।লন্ডনের Natural History Museum–এর গবেষক ইমেলিয়া ব্রানাগান-হ্যারিস (Emelia Branagan-Harris) বলেন, মঙ্গল গ্রহের চাঁদ ফোবোস (Phobos) ও ডেইমোস (Deimos)–এর উৎপত্তি এবং তারা কীভাবে গ্রহটির চারপাশে ঘুরতে শুরু করেছে এগুলো বোঝা গেলে মঙ্গল গ্রহের সামগ্রিক বিবর্তন ও ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এই চাঁদগুলো কীভাবে মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে এসেছে—এ নিয়ে দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। এক ব্যাখ্যা অনুসারে, লাল গ্রহটি হয়তো দুটি গ্রহাণুকে একসঙ্গে ধরে ফেলেছিল—যেগুলো আগে যুক্ত ছিল, পরে আলাদা হয়ে যায়, অথবা কাছাকাছি কক্ষপথে ঘুরছিল। আরেক মতে, একটি গ্রহাণু মঙ্গল গ্রহে আঘাত করলে সেখান থেকেই এই চাঁদগুলো তৈরি হয়েছে—যেমনভাবে পৃথিবীর চাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল
এ পর্যন্ত কোনো একটি ব্যাখ্যার পক্ষেই আমাদের প্রমাণ খুব সীমিত। তবে জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (Japan Aerospace Exploration Agency — JAXA)–এর মার্টিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন (Martian Moons exploration) মহাকাশযানটি—যা এপ্রিলের পর কোনো এক সময় উৎক্ষেপণ করা হবে—দুটি ব্যাখ্যার মধ্যে একটিকে নিশ্চিতভাবে বাদ দিতে পারবে বলে মনে করেন ইমেলিয়া ব্রানাগান-হ্যারিস (Emelia Branagan-Harris)। মহাকাশযানটিতে অনেকগুলো ক্যামেরা এবং স্পেকট্রোমিটার (spectrometers—আলো/তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে পদার্থ কী দিয়ে তৈরি তা বোঝার যন্ত্র) আছে, যা চাঁদগুলোর কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে ব্যবহার করা যাবে। এটি ২০২৭ সালে সেখানে পৌঁছানোর কথা। এ ছাড়া, এতে একটি রোভারও আছে, যা ফোবোস (Phobos)–এর পৃষ্ঠে নামিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
পর্যবেক্ষণে যদি প্রচুর কার্বনসমৃদ্ধ অণু (carbon-rich molecules) এবং পানি পাওয়া যায়, তাহলে এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে গ্রহাণু ধরে ফেলার (asteroid capture) ধারণাটিই সঠিক। কিন্তু যদি এগুলো না পাওয়া যায়, তাহলে বিশ্লেষণের জন্য নমুনাগুলো পৃথিবীতে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে—যা বর্তমানে ২০৩১ সালের জন্য নির্ধারিত।
এই নমুনাগুলোতে থাকবে ফোবোসের পৃষ্ঠের পাথর, এবং মাটির কয়েক সেন্টিমিটার নিচ থেকে নেওয়া পাথরও। আমরা যখন পদার্থটিকেই পরীক্ষা করতে পারব, তখন দেখা যাবে এতে অতীতে গলে যাওয়ার কোনো চিহ্ন আছে কি না। এরপর সেখান থেকে বোঝা যাবে—এটি কি মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে কোনো সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয়েছিল কি না।
ফোবোস (Phobos)–এর উৎপত্তি যাই হোক না কেন, এটি মঙ্গল গ্রহের এত কাছ দিয়ে কক্ষপথে ঘোরে যে, এতে মঙ্গলের ইতিহাসের আগের সময়ের ভালোভাবে সংরক্ষিত নমুনা থাকতে পারে। ইমেলিয়া ব্রানাগান-হ্যারিস (Emelia Branagan-Harris) বলেন, “সম্ভবত ফোবোসে প্রাচীন মঙ্গলের কিছু অংশ থাকতে পারে—যখন সেখানে তরল পানি ছিল। ফলে আমরা মঙ্গল গ্রহের ইতিহাস সম্পর্কেও অনেক কিছু জানতে পারব।”

চিত্র ৩.৯ : একটি মহাকাশযান সৌরজগতের প্রাচীন বস্তু পর্যবেক্ষণের জন্য অভিযানে যাচ্ছে
মঙ্গল থেকে বুধে
এ বছর আমরা বুধ গ্রহের রহস্যও জানতে শুরু করতে পারি। কারণ বেপিকলম্বো (BepiColombo) মিশনটি সৌরজগতের সবচেয়ে ভেতরের গ্রহ বুধ (Mercury)–এর কক্ষপথে নামতে যাচ্ছে।বেপিকলম্বো (BepiColombo) মিশনটি দুটি মহাকাশযান নিয়ে গঠিত—একটি ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (European Space Agency — ESA) এবং অন্যটি জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (Japan Aerospace Exploration Agency — JAXA)–এর। মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটার (Mercury Planetary Orbiter — MPO) এবং মার্কারি ম্যাগনেটোস্ফেরিক অরবিটার (Mercury Magnetospheric Orbiter — Mio)—এই দুটি মহাকাশযান একটি মূল যান বা মার্কারি ট্রান্সফার মডিউল (Mercury Transfer Module — MTM)–এর সঙ্গে যুক্ত থাকে।
২০১৮ সালে উৎক্ষেপণের পর থেকে এমটিএম (MTM) বুধ গ্রহের পাশ দিয়ে ছয়বার উড়ে গেছে।প্রতিবারই এটি বুধের মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে নিজের গতি কমিয়েছে, যাতে ধীরে ধীরে নেমে এসে সহজে কক্ষপথে ঢুকতে পারে। এই কৌশলটি আবিষ্কার করেছিলেন এই মিশনের নামের সঙ্গে যুক্ত পদার্থবিদ জিউসেপে “বেপি” কোলম্বো (Giuseppe “Bepi” Colombo)।মিশনটি ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করেছে—যেমন সৌর বায়ু (solar wind) সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত এবং বুধের পৃষ্ঠের উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি। কিন্তু এর সবচেয়ে শক্তিশালী কিছু যন্ত্র—যেমন ESA–র এমপিও (MPO)–তে থাকা দুটি এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার (X-ray spectrometers—এক্স-রে বিশ্লেষণ করে পদার্থের উপাদান বোঝার যন্ত্র)—এখনও ব্যবহার করা যায়নি। কারণ তাদের দৃষ্টিপথ এমটিএম (MTM)–এর কারণে ঢেকে ছিল।
গ্রহগুলো কীভাবে তৈরি হলো তা যদি বোঝা যায়, তাহলে পুরো সৌরজগতকেই বোঝা সম্ভব।
এ বছর উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত একটি মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহের চাঁদগুলোর কক্ষপথে ঘুরবে।
সেপ্টেম্বরে এমপিও (MPO) ও মিও (Mio) এমটিএম (MTM)–থেকে আলাদা হবে এবং কক্ষপথে নামার প্রক্রিয়া শুরু করবে। ধারণা করা হচ্ছে, নভেম্বরের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তখন তারা শেষ পর্যন্ত গ্রহটিকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পারবে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লেস্টার (University of Leicester)–এর চার্লি ফেল্ডম্যান (Charly Feldman) এমপিও–এর একটি যন্ত্র তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, “এটা অনেকদিন ধরে তৈরি হচ্ছে। তাই এটি যেমন ভীষণ আশাব্যঞ্জক, তেমনি একটু নার্ভাসও লাগছে।”আগের যেকোনো মিশনের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তারিতভাবে বুধের চৌম্বকীয় পরিবেশ (magnetic environment)–এর ছবি তোলা হবে। একই সঙ্গে এমপিও (MPO)–এর স্পেকট্রোমিটার (spectrometers—আলো/তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে পদার্থ কী দিয়ে তৈরি তা বোঝার যন্ত্র)–এর মতো যন্ত্র ব্যবহার করে বুধের পৃষ্ঠকে ব্যাপকভাবে মানচিত্রায়ন (mapped) ও বিশ্লেষণ করা হবে। ফেল্ডম্যান বলেন, “এটি অন্য কোনো গ্রহীয় বস্তুর পৃষ্ঠের প্রথম এক্স-রে ছবি (X-ray images) তুলবে।”


Leave a Reply