ফুটবল : এই বিশ্বকাপ যেন মেসি, এমবাপ্পে ও রোনালদোদেরই

তারকাদের দাপটে জমে ওঠা বিশ্বকাপ থেকে আমরা জানতে পারি, কীভাবে প্রতিভাবানদের সামলাতে হয়। 

কখনো কখনো সেরা ফুটবলাররাও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভুল করে বসেন। অতিরিক্ত চাপে তারা মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন না। ইতিহাস গড়ার সুযোগ সামনে এসেও পেনাল্টি শট অনেক দূরে মেরে ফেলেন। তাই বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে অনেক সময় সেরা খেলোয়াড়রাও ব্যর্থ হন। তখন মনে হয়, তারা হয়তো প্রকৃত প্রতিভার চেয়ে প্রচারের কারণেই বেশি বিখ্যাত। 

কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ  চিত্রটি ভিন্ন। পুরো আসরজুড়েই দাপট দেখিয়েছেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকারা। তাদের এই পারফরম্যান্স শুধু খেলাধুলার জন্যই নয়, যে কোনো প্রতিষ্ঠানে তারকাখ্যাতিসম্পন্ন মানুষদের কীভাবে পরিচালনা করা উচিত, সে বিষয়েও বিষয় উঠে এসেছে। 

আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকা লিওনেল মেসি (Lionel Messi) মাত্র তিনটি ম্যাচে ছয়টি গোল করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করার নতুন রেকর্ড গড়েছেন। ১ জুলাই পর্যন্ত ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে (Kylian Mbappé)–ও ছয়টি গোল করেছেন। নরওয়ের আর্লিং হলান্ড (Erling Haaland) করেছেন পাঁচটি গোল। আর ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (Vinícius Júnior) করেছেন চারটি। অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সে পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (Cristiano Ronaldo) বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হয়েছেন। 

এমন পারফরম্যান্স কিন্তু সব সময় দেখা যায় না। এর একটি কারণ হলো, অনেক বড় তারকাই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পান না। কারণ তাদের দেশই বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। উত্তর আয়ারল্যান্ডের জর্জ বেস্ট (George Best)–এর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। পরে তিনি বেপরোয়া জীবনযাপনের জন্যও পরিচিত হন। একইভাবে লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়া (George Weah) কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি। পরে অবশ্য তিনি নিজের দেশের প্রেসিডেন্ট হন।

আবার অনেক সময় বড় তারকাদের ছাপিয়ে যান কম পরিচিত খেলোয়াড়রা। কেউ হয়তো জীবনের সেরা পারফরম্যান্সটি বিশ্বকাপেই করেন, যা তিনি আগে বা পরে আর কখনো করতে পারেন না। আবার কখনো নতুন কোনো তরুণ খেলোয়াড় হঠাৎ করেই সবার নজর কাড়েন। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের আগে ১৭ বছর বয়সী পেলে (Pelé) ব্রাজিলের বাইরে প্রায় অপরিচিত ছিলেন। কিন্তু ফাইনালে তিনি এক সুইডিশ ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে বল তুলে নিয়ে দারুণ এক ভলিতে গোল করেন। সেই ম্যাচের পরই তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

পেলের জীবন আরেকটি বিষয়ও দেখায়। বড় তারকারা অনেক সময় শুধু চাপের কারণেই ব্যর্থ হন না, প্রতিপক্ষের কঠোর ট্যাকলের কারণেও ছন্দ হারিয়ে ফেলেন। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে এক ডিফেন্ডারের শক্ত ট্যাকলে পেলে মাটিতে পড়ে যান। কষ্ট করে আবার উঠে দাঁড়ালেও কিছুক্ষণ পর আবারও ট্যাকলের শিকার হন। এরপর পুরো ম্যাচের বাকি সময় তাকে প্রায় এক পায়ে ভর করেই খেলতে হয়।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপেও প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা (Diego Maradona)–কে একইভাবে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর কোনো খেলোয়াড় এত বেশি ফাউলের শিকার হননি। কিন্তু তাতেও তাকে থামানো যায়নি।

শুধু ফুটবল নয়, অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। অনেক সময় সবচেয়ে বড় তারকারাও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের চাপ সামলাতে পারেন না। বরং এত বড় তারকা হওয়ার চাপই তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ আবেগের বশে এমন কাজ করে বসেন, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। যেমন ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড (Frank Rijkaard) এক জার্মান স্ট্রাইকারের চুলে থুতু ছুড়ে দিয়েছিলেন। আবার ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের তারকা রোনালদো (Ronaldo) আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। ফাইনাল শুরুর আগে তিনি খিঁচুনিতে আক্রান্ত হন।

এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় পেনাল্টি শুটআউটে। ২০০৯ সালে নরওয়ের স্কুল অব স্পোর্টস সায়েন্সেস (Norwegian School of Sports Sciences)–এর গেইর জর্ডেট (Geir Jordet) দেখিয়েছিলেন, বড় তারকারা তুলনামূলক কম পরিচিত খেলোয়াড়দের চেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস করেন। সম্ভবত সবার প্রত্যাশার চাপই এর কারণ। তবে পরে এই প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে। ধারণা করা হয়, বড় খেলোয়াড়রা এখন পেনাল্টির জন্য আরও ভালো প্রস্তুতি নেন।

শুধু একজন খেলোয়াড় নয়, কখনো কখনো পুরো দলও এমন মানসিক চাপে ভুগতে পারে। ইংল্যান্ড দলকে প্রতিবার বিশ্বকাপে এমন আশা নিয়ে বিদায় দেওয়া হয়, যেন এবার তারা হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবেই। কিন্তু গত ৬০ বছর ধরে সেই স্বপ্ন পূরণের চেষ্টায় তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

তাহলে এবার এত বড় বড় তারকা কেন নিজেদের সেরাটা দেখাতে পারলেন?

এখান থেকে যে কোনো দলের নেতৃত্ব দেওয়া মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যায়। এই দলগুলো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তিকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো যায়। তবে সব সময় এমনটা হয় না। ক্লাব ফুটবলে দারুণ সফল অনেক খেলোয়াড়ই জাতীয় দলে এসে প্রত্যাশামতো খেলতে পারেন না। কারণ সেই দলটি তাদের দক্ষতাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর মতো করে প্রস্তুত থাকে না।

এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কৌশল ছিল সুযোগ পেলেই গোলপোস্টের কাছাকাছি থাকা মেসির (Lionel Messi) কাছে বল পৌঁছে দেওয়া। অন্যদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (Cristiano Ronaldo) কখনো কখনো মাঠে ধীরে চলাফেরা করলেও, পর্তুগালের আক্রমণের মূল ভরসা ছিলেন তিনিই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তারকাদের এমন সুযোগ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা নিজেদের সবচেয়ে ভালো কাজটিতেই মনোযোগ দিতে পারেন—অর্থাৎ গোল করা। যেমন কোনো প্রতিষ্ঠানের দক্ষ কর্মীদের অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজ থেকে মুক্ত রাখা হয়, তেমনি এই খেলোয়াড়দেরও সাধারণত রক্ষণভাগে খুব বেশি দায়িত্ব পালন করতে হয় না। সেই দায়িত্ব সামলান দলের অন্য দক্ষ খেলোয়াড়রা। তাই শুধু তারকারাই ভালো খেলেননি, পুরো দল ভালো খেলেছে বলেই তারকারাও নিজেদের সেরাটা দেখাতে পেরেছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোচরা তাদের সেরা খেলোয়াড়দের ওপর সব সময় আস্থা রেখেছেন। যেমন ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁ (Didier Deschamps), এমবাপ্পে (Kylian Mbappé) রক্ষণভাগে খুব বেশি দৌড়ান না—এমন সমালোচনা প্রকাশ্যে নাকচ করে দিয়েছেন। কোচের এমন সমর্থন, আর মাঠে সতীর্থদের সহযোগিতা—দুটিই একজন তারকার ওপর থাকা বিশাল প্রত্যাশার চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়। তাই যদি আপনি চান আপনার দলের সেরা মানুষগুলো নিজেদের সেরাটা দেখাক, তাহলে আগে এমন পরিবেশ তৈরি করুন, যেখানে তারা বুঝতে পারে দল তাদের ওপর বিশ্বাস রাখে এবং তাদের মূল্য দেয়।

এগুলো থেকেই পাওয়া যায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এমবাপ্পে, মেসি আর অন্য তারকাদের এই সাফল্য আমাদের আরেকটি বিষয়ও ভাবতে শেখায়।

অনেকের ধারণা, শুধু ফুটবল নয়, যেকোনো ক্ষেত্রেই তারকা হয়ে ওঠা অনেকটাই ভাগ্য, সঠিক সময়, ভালো প্রচার আর ব্যক্তিগত আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে। প্রতিভা সেখানে একমাত্র বিষয় নয়। মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেমান (Daniel Kahneman) লিখেছিলেন, “সাফল্য = প্রতিভা + ভাগ্য।” আর “বড় সাফল্য = একটু বেশি প্রতিভা + অনেক বেশি ভাগ্য।”

অর্থাৎ অনেকের মতে, জীবনে সব সময় যোগ্যতারই মূল্যায়ন হয় না।

কিন্তু অন্তত এই বিশ্বকাপ যেন ভিন্ন একটি গল্প বলছে। এখানে বড় তারকারা শুধু নামের কারণেই আলোচনায় ছিলেন নন, মাঠের খেলায়ও তারা সেই মর্যাদার প্রমাণ দিয়েছেন। এখানে তাদের নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল, সেটি সত্যিই তাদের পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হয়েছে।

সুপারস্টারদের বিশ্বকাপ, নাকি আত্মত্যাগী ফুটবলারদের?

Debbrata Mukherjee (দেবব্রত মুখোপাধ্যায়)

২০২৬ সালের বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এসে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। এবারের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে জায়গা করে নিয়েছেন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় তারকারা। ছয় গোল নিয়ে শীর্ষে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসি। পাঁচ গোল করে তাঁদের পেছনে আছেন হ্যারি কেইন ও আরলিং হালান্ড। চার গোল নিয়ে প্রতিযোগিতায় রয়েছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও উসমান দেমবেলে।

এমন দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পরিচিত মনে হলেও বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি মোটেও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। কারণ ক্লাব ফুটবলে যাঁরা মৌসুমজুড়ে আধিপত্য দেখান, বিশ্বকাপে এসে তাঁদের অনেকেই সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন না। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই আসর বরাবরই সুপারস্টারদের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মঞ্চ। ফলে একই বিশ্বকাপে বিশ্বের এতগুলো প্রতিষ্ঠিত তারকাকে একসঙ্গে নিজেদের সেরা ছন্দে দেখা সত্যিই ব্যতিক্রমী।

এই কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম এবারের আসরকে “সুপারস্টারদের বিশ্বকাপ” বলে অভিহিত করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে The Economist এবং The Athletic—দুই প্রতিষ্ঠানই বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে, কেন ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে একসঙ্গে এত বেশি সুপারস্টার তাঁদের স্বাভাবিক মানের খেলাটা খেলতে পারছেন।

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফুটবল ইতিহাস বরং উল্টো গল্পই বলে।

ক্লাব ফুটবলের কিংবদন্তি হওয়া মানেই বিশ্বকাপের কিংবদন্তি হওয়া নয়। জিকো, সক্রেটিস, লুইস ফিগো, রাউল, ওয়েন রুনি, নেইমার কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—নিজ নিজ ক্লাবের ইতিহাসে তাঁদের অবস্থান প্রশ্নাতীত। কিন্তু বিশ্বকাপের আলোচনায় তাঁদের নাম খুব কমই সেই উচ্চতায় উচ্চারিত হয়। কেউ কেউ স্মরণীয় কিছু ম্যাচ খেলেছেন, কেউ গুরুত্বপূর্ণ গোলও করেছেন; কিন্তু তাঁদের সামগ্রিক বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার কখনোই ক্লাব পর্যায়ের সাফল্যের সমতুল্য হয়ে ওঠেনি।

অন্যদিকে, পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা, ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ার, জিনেদিন জিদান, রোনালদো নাজারিও কিংবা লিওনেল মেসির মতো অল্প কয়েকজন খেলোয়াড়ই এই দুই মঞ্চে সমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। বর্তমান প্রজন্মে কিলিয়ান এমবাপ্পেও ধীরে ধীরে সেই বিরল তালিকায় নিজের জায়গা করে নিচ্ছেন।

এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে।

যদি ইতিহাস বলে বিশ্বকাপে সুপারস্টারদের উজ্জ্বল হওয়াই ব্যতিক্রম, তাহলে ২০২৬ সালে একসঙ্গে এতজন তারকা কীভাবে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলছেন? এটি কি কেবল কাকতালীয়, নাকি আধুনিক ফুটবলের ভেতরে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেছে, যা এই বাস্তবতাকে বদলে দিচ্ছে?

The Economist মনে করে, এর পেছনে শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভা নয়, বরং ফুটবল পরিচালনার দর্শন, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দলগত দায়িত্ব বণ্টনের একটি মৌলিক পরিবর্তন কাজ করছে। আর সেই পরিবর্তনই এবারের বিশ্বকাপকে আগের আসরগুলোর তুলনায় আলাদা করে তুলেছে।

এই পরিবর্তনটি বোঝার জন্য প্রথমে জানতে হবে, বিশ্বকাপের মঞ্চে সুপারস্টারদের ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলো কী।

কেন বিশ্বকাপে সুপারস্টাররা ম্লান হয়ে যান?

বিশ্বকাপে সুপারস্টারদের ব্যর্থতা আসলে কোনো বিস্ময়ের বিষয় নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে সেটিই ছিল স্বাভাবিক বাস্তবতা। ক্লাব ফুটবলে যেসব খেলোয়াড় বছরের পর বছর অসাধারণ ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন, বিশ্বকাপে এসে তাঁদের অনেককেই যেন চেনা যায় না। প্রশ্ন হলো, কেন?

প্রথম কারণটি শারীরিক।

বিশ্বকাপের আগে ইউরোপের ঘরোয়া মৌসুম শেষ হয় সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। লিগ, ঘরোয়া কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ইউরোপা লিগ—সব মিলিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলারদের প্রায় বিরামহীনভাবে খেলতে হয়। মৌসুম শেষ হওয়ার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে শুরু হয়ে যায় বিশ্বকাপ। ফলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুনরুদ্ধার কিংবা নতুন করে শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত থাকে।

অর্থাৎ, অনেক খেলোয়াড় বিশ্বকাপে পৌঁছান এমন এক অবস্থায়, যখন তাঁদের শরীর ইতোমধ্যেই একটি দীর্ঘ মৌসুমের ধকল বহন করছে।

তবে শারীরিক ক্লান্তিই একমাত্র ব্যাখ্যা নয়।

বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত থাকে এক ধরনের মানসিক চাপ, যার তুলনা ফুটবলের অন্য কোনো প্রতিযোগিতার সঙ্গে করা কঠিন। ক্লাব ফুটবলে একটি খারাপ ম্যাচের পর সামনে আরেকটি ম্যাচ থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপে একটি ভুল, একটি ব্যর্থতা কিংবা একটি পরাজয় পুরো টুর্নামেন্টের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

এর সঙ্গে যোগ হয় প্রত্যাশার ভার।

একজন সুপারস্টার যখন বিশ্বকাপে মাঠে নামেন, তখন তাঁর কাঁধে শুধু একটি দলের নয়, কখনো কখনো পুরো দেশের প্রত্যাশা এসে পড়ে। কোটি কোটি মানুষ তাঁর প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সুযোগের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই চাপের মধ্যেও নিজের স্বাভাবিক খেলাটা ধরে রাখা সহজ নয়।

আরও একটি বড় কারণ রয়েছে—প্রতিপক্ষের প্রস্তুতি।

ক্লাব ফুটবলে একটি দলের শক্তি অনেক খেলোয়াড়ের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ জানে, একটি নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে থামাতে পারলেই পুরো দলের আক্রমণ অনেকটাই ভেঙে দেওয়া সম্ভব। তাই কৌশলের বড় অংশই তৈরি হয় সেই একজনকে ঘিরে।

কখনো দুইজন, কখনো তিনজন খেলোয়াড় মিলে তাকে ঘিরে রাখে। বল পেলেই চাপ সৃষ্টি করা হয়। জায়গা দেওয়া হয় না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ক্লাব ফুটবলে যে স্বাধীনতা একজন সুপারস্টার পান, বিশ্বকাপে এসে সেটি প্রায়ই হারিয়ে যায়।

এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি মৌলিক পার্থক্য।

ক্লাব ফুটবলে একজন খেলোয়াড় বছরের প্রায় পুরোটা সময় একই সতীর্থদের সঙ্গে কাটান। প্রতিদিনের অনুশীলন, অসংখ্য ম্যাচ এবং দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত বোঝাপড়া তৈরি হয়। কে কখন কোথায় দৌড় দেবেন, কার কাছ থেকে কী ধরনের পাস আসবে কিংবা কোন মুহূর্তে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এসব অনেক সময় ভাষা ছাড়াই বুঝে নেওয়া যায়।

জাতীয় দলে সেই সুযোগ থাকে না।

বিশ্বকাপের আগে অল্প কয়েক দিনের প্রস্তুতিতে এমন সমন্বয় গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। খেলোয়াড়রা সারা বছর ভিন্ন ভিন্ন ক্লাব, ভিন্ন ভিন্ন কৌশল এবং ভিন্ন ভিন্ন কোচের অধীনে খেলেন। ফলে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এসে সেই বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি কার্যকর দলে রূপ দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এই কারণেই ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি, ক্লাব ফুটবলের সেরা খেলোয়াড়দের অনেকেই বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য প্রকাশ করতে পারেননি।

বরং ব্যতিক্রম তাঁরা, যাঁরা সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেও দুই মঞ্চেই সমান সফল হয়েছেন।

ঠিক এখানেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতিহাস থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এবার শুধু একজন বা দুজন নন, একসঙ্গে অনেক সুপারস্টার নিজেদের সেরা খেলাটা খেলছেন। প্রশ্ন হলো, এত দিনের এই বাস্তবতা হঠাৎ বদলে গেল কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই The Economist আধুনিক ফুটবলের ভেতরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তনের দিকে নজর দিয়েছে। তাদের মতে, বিষয়টি শুধু খেলোয়াড়দের প্রতিভা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না; বরং বদলে গেছে খেলোয়াড়দের ব্যবহার, দল পরিচালনার কৌশল এবং সাফল্যকে দেখার পুরো দর্শন।

কী বদলে গেল ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে?

যদি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সুপারস্টারদের ম্লান হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে হঠাৎ কী পরিবর্তন ঘটল? কেন এবার একই সঙ্গে এতজন বিশ্বমানের ফুটবলার ক্লাবের মতোই জাতীয় দলের জার্সিতেও প্রভাব বিস্তার করছেন?

The Economist–এর মতে, এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু খেলোয়াড়দের দিকে তাকালে হবে না; তাকাতে হবে আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তিত কাঠামোর দিকে।

প্রথম পরিবর্তনটি এসেছে খেলোয়াড়দের শারীরিক ব্যবস্থাপনায়।

একসময় একটি মৌসুমে কত ম্যাচ খেললেন, কত মিনিট মাঠে থাকলেন বা শরীরের ওপর কতটা চাপ পড়ল—এসব বিষয়ে বর্তমানের মতো সূক্ষ্ম নজরদারি ছিল না। অনেক সময় একজন তারকা ফুটবলারকে মৌসুমজুড়েই প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে হতো। ফলাফল যা হওয়ার তাই হতো—বিশ্বকাপে পৌঁছানোর আগেই তাঁর শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ত।

আজ পরিস্থিতি ভিন্ন।

ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো এখন খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। জিপিএস ট্র্যাকার, বিভিন্ন বায়োমেট্রিক সেন্সর, পারফরম্যান্স অ্যানালিটিক্স এবং স্পোর্টস সায়েন্সের সাহায্যে প্রতিটি খেলোয়াড়ের ওপর কতটা চাপ পড়ছে, কখন বিশ্রাম প্রয়োজন, কখন তাকে মাঠে নামানো ঝুঁকিপূর্ণ—এসব সিদ্ধান্ত এখন তথ্যভিত্তিকভাবে নেওয়া হয়।

অর্থাৎ, আধুনিক ফুটবল শুধু খেলোয়াড় তৈরি করছে না; তাদের দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখার চেষ্টাও করছে।

এ কারণে বড় ক্লাবগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি রোটেশন নীতি অনুসরণ করছে। একই পজিশনে একাধিক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় রাখার উদ্দেশ্য শুধু বিকল্প তৈরি করা নয়; বরং মৌসুমজুড়ে কারও ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়া নিশ্চিত করা।

The Economist মনে করে, এর সুফল বিশ্বকাপেও দেখা যাচ্ছে। মৌসুম শেষে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতেজ অবস্থায় খেলোয়াড়রা জাতীয় দলে যোগ দিচ্ছেন।

তবে এটিই পুরো ব্যাখ্যা নয়।

তাদের মতে, আরও বড় পরিবর্তন ঘটেছে দল পরিচালনার দর্শনে।

এই পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে The Economist কর্পোরেট জগতের একটি পরিচিত ধারণার কথা উল্লেখ করেছে—“রেইনমেকার” (Rainmaker)

কর্পোরেট জগতে রেইনমেকার বলতে এমন একজনকে বোঝানো হয়, যিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি মূল্য সৃষ্টি করেন। একই প্রতিষ্ঠানে অনেক দক্ষ মানুষ থাকতে পারেন, কিন্তু কিছু ব্যক্তি এমন থাকেন, যাঁদের সিদ্ধান্ত, দক্ষতা বা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে অসাধারণ প্রভাব ফেলে।

তাই অনেক প্রতিষ্ঠান তাঁদের জন্য আলাদা কাজের পরিবেশ তৈরি করে।

তাঁদের ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়। যে কাজ অন্য কেউ করতে পারে, সেটি তাঁদের দিয়ে করানো হয় না। উদ্দেশ্য একটাই—যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি মূল্য তৈরি করেন, তাঁর সময় ও শক্তি যেন সেই কাজেই ব্যয় হয়, যেখানে তিনি সত্যিই অনন্য।

The Economist–এর মতে, আধুনিক ফুটবলও ধীরে ধীরে একই দর্শনের দিকে এগোচ্ছে।

আজকের সফল দলগুলো বুঝে গেছে, তাদের সবচেয়ে বড় তারকাকে সব দায়িত্ব দিয়ে ক্লান্ত করে তোলার কোনো অর্থ নেই। বরং যে কাজটি তিনি অন্য সবার চেয়ে ভালো করতে পারেন, তাঁকে সেই কাজের জন্যই প্রস্তুত রাখা উচিত।

অর্থাৎ, একজন সুপারস্টারের সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিভার ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে দল তাঁকে কতটা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে তার ওপরও।

এখান থেকেই আধুনিক ফুটবলের একটি নতুন দর্শনের শুরু।

আগে প্রশ্ন ছিল—“দলের সেরা খেলোয়াড়কে দিয়ে কত বেশি কাজ করানো যায়?”

এখন প্রশ্নটি বদলে হয়েছে—“কী করলে দলের সেরা খেলোয়াড় তাঁর সেরা কাজটি করতে পারবেন?”

এই পরিবর্তনটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও, The Economist–এর মতে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা এখানেই লুকিয়ে আছে।

আধুনিক ফুটবলের নতুন দর্শন: “রেইনমেকার” নীতি

কর্পোরেট জগতের “রেইনমেকার” ধারণাটি ফুটবলে কীভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, The Economist–এর বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত এটিই।

মূল ধারণাটি খুব সহজ। একটি প্রতিষ্ঠানে সবাই সমান ভূমিকা পালন করেন না। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি মূল্য সৃষ্টি করেন। তাই একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক চেষ্টা করেন, তাঁদের সময় ও শক্তি যেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজেই ব্যয় হয়। যে দায়িত্ব অন্য কেউ পালন করতে পারে, সেটি তাঁদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় না।

The Economist–এর মতে, আধুনিক ফুটবলও ধীরে ধীরে একই বাস্তবতা মেনে নিতে শুরু করেছে।

আগে একজন সুপারস্টারের কাছ থেকে প্রায় সব ধরনের দায়িত্বই প্রত্যাশা করা হতো। আক্রমণ গড়া, বল উদ্ধার, রক্ষণে নেমে আসা, পুরো মাঠজুড়ে দৌড়ানো—সবকিছুই যেন তাঁকেই করতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ের সফল দলগুলো বুঝতে পেরেছে, এতে দলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদই অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

তাই দায়িত্ব বণ্টনের দর্শন বদলেছে।

আজকের ফুটবলে প্রশ্নটি আর এই নয় যে একজন সুপারস্টার কতটা পরিশ্রম করছেন; বরং তিনি কোথায় পরিশ্রম করছেন এবং সেই পরিশ্রম দলকে কতটা মূল্য এনে দিচ্ছে।

লিওনেল মেসির খেলাই এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।

বর্তমান আর্জেন্টিনা দল খুব ভালো করেই জানে, মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি কী। তিনি পুরো মাঠজুড়ে নব্বই মিনিট দৌড়ে বেড়ানোর জন্য বিখ্যাত নন। তাঁর আসল শক্তি হলো—ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একটি পাস, একটি ড্রিবল কিংবা একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়া।

তাই আর্জেন্টিনা তাকে সেই কাজটিই করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

আগের মতো প্রতিটি আক্রমণ মেসিকেই নিচ থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। প্রতিটি বল উদ্ধারেও তাঁকে জড়াতে হচ্ছে না। মাঝমাঠে অপ্রয়োজনীয় লড়াইয়ে শক্তি ক্ষয় করার প্রয়োজনও কমে গেছে। এসব দায়িত্বের বড় অংশ এখন ভাগ করে নিচ্ছেন তাঁর সতীর্থরা।

ফলে মেসি নিজের শক্তি সংরক্ষণ করতে পারছেন সেই মুহূর্তগুলোর জন্য, যখন তাঁর সৃজনশীলতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

কারণ দলের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—মেসি সবচেয়ে বেশি দৌড়ালেন কি না, সেটি নয়; বরং তিনি ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দিতে পারলেন কি না।

কিলিয়ান এমবাপ্পের ক্ষেত্রেও একই দর্শন কাজ করছে, যদিও তাঁর শক্তির ধরন ভিন্ন।

মেসির মতো খেলা নয়, এমবাপ্পের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাঁর বিস্ফোরক গতি, ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা এবং মুহূর্তের মধ্যে রক্ষণ থেকে আক্রমণে রূপান্তর ঘটানোর সামর্থ্য। ফলে তাঁর কাছ থেকে সবসময় গভীর রক্ষণে নেমে একই মাত্রার পরিশ্রম আশা করলে সেই শক্তির অপচয়ই হবে।

এ কারণেই ফ্রান্সও তাঁর ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে।

যে কাজটি অন্য কোনো খেলোয়াড় করতে পারেন, সেটি এমবাপ্পের জন্য রেখে দেওয়া হচ্ছে না। বরং তাঁকে এমন অবস্থায় রাখা হচ্ছে, যেখানে তিনি তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিটিই ব্যবহার করতে পারেন।

অনেক সময় এ কারণে সমালোচনাও হয়। কেউ কেউ বলেন, এমবাপ্পে রক্ষণে যথেষ্ট শ্রম দেন না। কিন্তু The Economist–এর যুক্তি ভিন্ন। যদি একজন খেলোয়াড় আক্রমণে এমন মূল্য সৃষ্টি করতে পারেন, যা অন্য কেউ পারেন না, তাহলে তাঁর শক্তিকে সেই জায়গাতেই সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করাই দলগতভাবে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সুপারস্টারদের আর কোনো দায়িত্ব নেই। প্রয়োজন হলে মেসিও নিচে নেমে বল কাড়বেন, এমবাপ্পেও রক্ষণে সাহায্য করবেন। কিন্তু সেটি হবে পরিস্থিতির দাবি, তাঁদের প্রধান দায়িত্ব নয়।

এই পার্থক্যটিই আধুনিক ফুটবলের নতুন দর্শনকে আলাদা করেছে।

আগে দলের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়ের ওপরই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব দেওয়া হতো। এখন সফল দলগুলো ঠিক উল্টোটা ভাবছে। তারা চেষ্টা করছে, অপ্রয়োজনীয় দায়িত্ব অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে তাঁর প্রকৃত শক্তি প্রকাশের জন্য প্রস্তুত রাখতে।

আর এখানেই “রেইনমেকার” নীতির সঙ্গে আধুনিক ফুটবলের মিল সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সুপারস্টারদের সাফল্যের পেছনের অদৃশ্য শ্রম

“রেইনমেকার” নীতির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। এটি শুধু সুপারস্টারদের দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়ার কথা বলে না; বরং দলের অন্য খেলোয়াড়দের ভূমিকাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।

যদি একজন খেলোয়াড়কে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান কাজটি করার সুযোগ করে দিতে হয়, তাহলে বাকি দায়িত্বগুলো কেউ না কেউ গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ, একজন সুপারস্টারের সাফল্য যতটা তাঁর নিজের প্রতিভার ফল, ততটাই তাঁর সতীর্থদের আত্মত্যাগের ফল।

The Economist এই জায়গাটিকেই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে।

এবারের বিশ্বকাপে গোলদাতাদের তালিকার দিকে তাকালে সহজেই মনে হতে পারে, সবকিছুই যেন কয়েকজন সুপারস্টারকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। মেসি গোল করছেন, এমবাপ্পে গোল করছেন, কেইন গোল করছেন, দেমবেলে গোল করছেন। সংবাদমাধ্যমের আলোচনাও স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের ঘিরেই।

কিন্তু এই ছবির আরেকটি দিক রয়েছে, যা পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

ধরা যাক, একজন ফরোয়ার্ড ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি দৌড় দিলেন, যাতে দুইজন ডিফেন্ডার তাঁর দিকে চলে এলেন। সেই দৌড়ের ফলে পাশে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় বল পেলেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। গোলটি তাঁর নামের পাশে লেখা হলো, কিন্তু সুযোগটি তৈরি করেছিলেন অন্য একজন।

আবার একজন মিডফিল্ডার হয়তো নিজের আক্রমণের সুযোগ ছেড়ে দিয়ে আরও ভালো অবস্থানে থাকা সতীর্থকে বল বাড়িয়ে দিলেন। একজন উইঙ্গার হয়তো নিজে শট না নিয়ে এমনভাবে জায়গা তৈরি করলেন, যাতে দলের সুপারস্টার আরও সুবিধাজনক অবস্থান থেকে আক্রমণ শেষ করতে পারেন।

এই কাজগুলোর বেশির ভাগই পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান নয়।

কোনোটি গোল নয়।

কোনোটি অ্যাসিস্টও নয়।

তবু ম্যাচের ফল নির্ধারণে এগুলোর গুরুত্ব অনেক সময় শেষ শটটির চেয়েও বেশি।

আর্জেন্টিনার খেলাগুলোতে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

জুলিয়ান আলভারেজকে অনেক সময় গোলদাতাদের তালিকায় পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর অবদান কি তাই বলে কমে যায়? মোটেও নয়। অনেক আক্রমণে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের নিজের দিকে টেনে নিয়ে গেছেন, যাতে মেসির জন্য জায়গা তৈরি হয়। একইভাবে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের অনেক দৌড়, অবস্থান পরিবর্তন কিংবা অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট সরাসরি কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, অথচ সেগুলোই আক্রমণের ভিত্তি তৈরি করে।

ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজই আসলে বল ছাড়া সম্পন্ন হয়।

কে কোথায় দৌড় দিলেন, কে প্রতিপক্ষকে নিজের দিকে টানলেন, কে নিজের অবস্থান ছেড়ে অন্যের জন্য জায়গা তৈরি করলেন—এসব সিদ্ধান্তই প্রায়শই একটি আক্রমণের সফলতা নির্ধারণ করে। কিন্তু দর্শকের চোখ স্বাভাবিকভাবেই বলের দিকে থাকে। ফলে এই অদৃশ্য শ্রমের বড় অংশই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

এই কারণেই The Economist মনে করিয়ে দেয়, এবারের বিশ্বকাপের গল্প শুধু সুপারস্টারদের গল্প নয়। এটি এমন খেলোয়াড়দেরও গল্প, যাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলীয় সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তাঁরা জানেন, হয়তো গোলটি তাঁদের নামে লেখা হবে না। ম্যাচসেরার পুরস্কারও তাঁরা পাবেন না। তবু দলের সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড়টি যেন নিজের সেরাটা দিতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই তাঁরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

অর্থাৎ, একজন সুপারস্টার যতটা নিজের প্রতিভায় উজ্জ্বল, ততটাই উজ্জ্বল তাঁর চারপাশের সেই নীরব শ্রম, যা প্রায়ই চোখে পড়ে না।

আর সম্ভবত এখানেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

এটি এমন এক বিশ্বকাপ, যেখানে ব্যক্তিগত প্রতিভা ও দলগত আত্মত্যাগ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। একজনের সাফল্য অন্যজনের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই সুপারস্টারদের উজ্জ্বলতা বুঝতে হলে শুধু তাঁদের গোল বা অ্যাসিস্ট দেখলে হবে না; দেখতে হবে সেই দলটিকেও, যারা নিজেদের স্বীকৃতির চেয়ে দলের সাফল্যকে বড় করে দেখেছে।

এই আলোচনা থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়। শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই নয়, একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে কোচদের চিন্তাভাবনাতেও। আধুনিক ফুটবলের এই নতুন দর্শন সফল হওয়ার পেছনে তাঁদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

কোচদের বদলে যাওয়া মানসিকতা: সাফল্যের জন্য অহংকার নয়, অভিযোজন

এই পুরো আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আছেন, যাঁদের কথা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। তাঁরা হলেন কোচ এবং কোচিং স্টাফ।

The Economist মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক ফুটবলের এই পরিবর্তন শুধু খেলোয়াড়দের মানসিকতায় আসেনি; কোচদের চিন্তাভাবনাতেও একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে।

একসময় বড় দলের অনেক কোচ বিশ্বাস করতেন, দলের প্রতিটি খেলোয়াড়কে একই নিয়মে পরিচালনা করতে হবে। দলের সবচেয়ে বড় তারকাও তার ব্যতিক্রম নন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদের কৌশল বা কর্তৃত্বের সঙ্গে আপস করতে চাইতেন না। যেন দলের দর্শন খেলোয়াড়ের সঙ্গে মানিয়ে নেবে না; বরং খেলোয়াড়কেই কোচের দর্শনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

ফুটবল ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নয়, যেখানে এই মানসিকতার কারণে একটি প্রতিভাবান দলও নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য প্রকাশ করতে পারেনি। অনেক সময় সমস্যাটি কৌশলের ছিল না; ছিল অহংকারের। কোচ এবং তারকার মধ্যে অদৃশ্য এক ক্ষমতার লড়াই পুরো দলের সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যেন ভিন্ন একটি বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আজকের সফল কোচরা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেছেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়; দলের সর্বোচ্চ ফল নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যদি দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে কৌশল সাজাতে হয়, তাহলে সেটি দুর্বলতা নয়—বরং বাস্তববাদিতা।

এখানেই “রেইনমেকার” দর্শনের আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক যেমন প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মূল্যবান কর্মীকে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল অবস্থায় রাখার চেষ্টা করেন, তেমনি একজন আধুনিক কোচও চেষ্টা করেন তাঁর সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড়ের শক্তিকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে। এর অর্থ এই নয় যে তিনি নিজের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলছেন। বরং তিনি বুঝে নিচ্ছেন, ব্যক্তিগত অহংকারের চেয়ে দলীয় সাফল্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ধরা যাক, কোচিং স্টাফ লিওনেল মেসিকে বলছে, “তোমার সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতে আমরা কিছু পরিবর্তন আনতে চাই। তুমি কী মনে করো, কোন পরিবেশে তুমি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে?”

এতে কোচের মর্যাদা কমে যায় না।

কারণ একজন কোচের দায়িত্ব নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়; এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যা দলকে সবচেয়ে ভালো ফল এনে দেয়।

এই মানসিক পরিবর্তনই আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় শক্তি।

তবে বিষয়টি শুধু প্রধান কোচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

একটি জাতীয় দলের পেছনে বিশাল একটি কোচিং স্টাফ কাজ করে। সহকারী কোচ, বিশ্লেষক, ফিটনেস কোচ, গোলকিপিং কোচ—প্রত্যেকেরই নিজস্ব মতামত, অভিজ্ঞতা এবং কাজের ধরন রয়েছে। এই পুরো দলটি যদি একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ না করে, তাহলে প্রধান কোচের পরিকল্পনাও সফল হবে না।

অর্থাৎ, অভিযোজনের প্রয়োজন শুধু মাঠের খেলোয়াড়দের নয়; ডাগআউটের মানুষেরও।

তাঁদেরও অনেক সময় নিজেদের পুরোনো ধারণা, ব্যক্তিগত পছন্দ কিংবা অহংকার পাশে রাখতে হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত মূল্যায়ন হয় না কে কতটা ক্ষমতা দেখালেন; মূল্যায়ন হয় দল কতটা সফল হলো।

এই কারণেই The Economist শুধু আত্মত্যাগী খেলোয়াড়দের নয়, আত্মসমালোচনায় সক্ষম এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে প্রস্তুত কোচদেরও এই পরিবর্তনের অন্যতম নায়ক হিসেবে দেখেছে।

সম্ভবত এটাই আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

একজন ভালো কোচ সেই নন, যিনি সব সময় নিজের দর্শন খেলোয়াড়দের ওপর চাপিয়ে দেন। বরং ভালো কোচ তিনি, যিনি দলের প্রতিভা, সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবতাকে বুঝে নিজের দর্শনকেও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারেন।

এই কারণেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু খেলোয়াড়দের নয়, নেতৃত্বেরও একটি নতুন অধ্যায় রচনা করছে।

আর সেখানেই The Economist শেষবারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়—এই বিশ্বকাপের গল্প বলতে গিয়ে আমরা যেন কেবল সুপারস্টারদের গল্পই না বলি।

সুপারস্টারদের বিশ্বকাপ, নাকি আত্মত্যাগী ফুটবলারদের?

The Economist–এর বিশ্লেষণের শেষ অংশটি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানেই তারা একটি সূক্ষ্ম সতর্কবার্তা দেয়।

এবারের বিশ্বকাপে সুপারস্টারদের পারফরম্যান্স এতটাই চোখে পড়ার মতো যে পুরো টুর্নামেন্টটিকেই “সুপারস্টারদের বিশ্বকাপ” বলে বর্ণনা করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই বর্ণনা পুরোপুরি ভুল নয়। সত্যিই মেসি, এমবাপ্পে, কেইন, হালান্ড কিংবা দেমবেলের মতো খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরাটা খেলছেন।

কিন্তু এই ব্যাখ্যাটি যেন একমাত্র ব্যাখ্যায় পরিণত না হয়।

কারণ সুপারস্টারদের এই উজ্জ্বলতার পেছনে আরও একটি গল্প রয়েছে—যে গল্পটি সহজে চোখে পড়ে না।

মাঠে যে খেলোয়াড়টি গোল করেন, দর্শকের চোখ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দিকেই থাকে। সংবাদপত্রের শিরোনামেও থাকে তাঁর নাম। কিন্তু সেই গোলটি সম্ভব করার জন্য আরও অনেক খেলোয়াড় নিজেদের স্বাভাবিক দায়িত্বের বাইরেও কাজ করেন। কেউ অতিরিক্ত দৌড় দেন, কেউ নিজের অবস্থান ছেড়ে জায়গা তৈরি করেন, কেউ ব্যক্তিগত সাফল্যের সুযোগ ত্যাগ করে দলের সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড়ের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেন।

তাঁদের অবদান হয়তো গোল বা অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, কিন্তু দলের সাফল্যে তার গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়।

এই কারণেই এবারের বিশ্বকাপকে শুধু সুপারস্টারদের বিশ্বকাপ বললে পুরো সত্যটি বলা হয় না। বরং এটি এমন এক বিশ্বকাপ, যেখানে আত্মত্যাগী ফুটবলারদের অবদান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান।

তবে এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু খেলোয়াড়দের নয়, কোচদের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একসময় অনেক কোচের মধ্যেই একটি প্রবণতা ছিল—দলের সবচেয়ে বড় তারকাকেও নিজের কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। কিন্তু আধুনিক ফুটবল ধীরে ধীরে সেই চিন্তা থেকে সরে এসেছে।

আজকের সফল কোচরা বুঝেছেন, দলের সেরা খেলোয়াড়কে নিজের দর্শনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোই নেতৃত্ব নয়। প্রকৃত নেতৃত্ব হলো দলের বাস্তবতা বুঝে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রত্যেকে নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য প্রকাশ করতে পারে।

প্রয়োজনে কোচকেও নিজের চিন্তাভাবনা বদলাতে হয়।

প্রয়োজনে নিজের অহংকারও পাশে রাখতে হয়।

যদি দলের সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড়কে আরও স্বস্তিদায়ক একটি ভূমিকা দেওয়া দলের সাফল্য বাড়ায়, তাহলে সেটিই গ্রহণ করা উচিত। একজন কোচের দায়িত্ব নিজের কর্তৃত্ব প্রদর্শন করা নয়; দলের সর্বোচ্চ ফল নিশ্চিত করা।

এই পরিবর্তন শুধু প্রধান কোচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো কোচিং স্টাফকেই একই মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হয়। সহকারী কোচ, বিশ্লেষক, ফিটনেস কোচ—সবাইকে ব্যক্তিগত মত বা পছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়—

কোন সিদ্ধান্তটি দলকে সবচেয়ে ভালো ফল এনে দেবে?

যখন খেলোয়াড়রা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দলকে বড় করে দেখেন, কোচরা নিজেদের অহংকারের চেয়ে ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেন, আর পুরো দল একজন সুপারস্টারের শক্তিকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর জন্য একসঙ্গে কাজ করে—তখনই এমন ফুটবল জন্ম নেয়, যা বিশ্বকাপকে অসাধারণ করে তোলে।

দর্শক হিসেবে আমরা সেই ফলটাই দেখি।

আমরা দেখি মেসির জাদু।

আমরা দেখি এমবাপ্পের গতি।

আমরা দেখি কেইনের নিখুঁত ফিনিশিং।

কিন্তু এই প্রতিটি মুহূর্তের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অদৃশ্য সিদ্ধান্ত, নীরব শ্রম এবং স্বীকৃতিহীন আত্মত্যাগ।

তাই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই—

মহান দল গড়ে ওঠে শুধু মহান খেলোয়াড় দিয়ে নয়; গড়ে ওঠে এমন খেলোয়াড়দের দিয়ে, যারা প্রয়োজন হলে নিজেদের আলো অন্যের ওপর ফেলতে প্রস্তুত থাকেন।

এই কারণেই আমার কাছে মনে হয়, এবারের বিশ্বকাপকে শুধু “সুপারস্টারদের বিশ্বকাপ” বলা যথেষ্ট নয়।

বরং এটিকে বলা যেতে পারে “আত্মত্যাগী ফুটবলারদের বিশ্বকাপ”

কারণ সেই আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই সুপারস্টাররা তাঁদের শ্রেষ্ঠ রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়েছেন।

বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হোক। সুপারস্টাররা আরও উজ্জ্বল হোন। একই সঙ্গে যাঁদের নীরব শ্রমে সেই উজ্জ্বলতা সম্ভব হচ্ছে, সেই আত্মত্যাগী ফুটবলাররাও তাঁদের প্রাপ্য স্বীকৃতি লাভ করুন।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *