বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯১–২০০৮): ভোট শতাংশ ও আসন সংখ্যার বিস্তারিত তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, গণতন্ত্র রক্ষায় দরকার দুই কক্ষের সংসদ

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায়ই একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য দেখা যায়— ভোট শতাংশ ও সংসদে আসন সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। মূলত, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা “প্রথমে বেশি ভোট পেলেই জয়ী” (First-Past-The-Post বা FPTP) হওয়ার কারণেই এমনটি ঘটে। এই ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট আসনে যিনি সর্বাধিক ভোট পাবেন তিনিই বিজয়ী হবেন, তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট (৫০%-এর বেশি) না পেলেও। এর ফলে অনেক সময় দেখা যায়, সামান্য ব্যবধানে বেশি আসন পেয়ে যায় কোনো একটি দল, আবার অন্য একটি দল উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েও আসন কম পায়।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি (৩০.৮১%) ও আওয়ামী লীগের (৩০.০৮%) মধ্যে ভোটের পার্থক্য মাত্র ০.৭৩%, কিন্তু বিএনপি ১৪০টি (৪৬.৬৬%) আসন পেয়েছিল, যেখানে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৮টি (২৯.৩৩%) আসন। এখানে আসনের পার্থক্য ছিল ৫২টি (১৭.৩৩%)।

১৯৯৬ সালের জুন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩৭.৪৪% ভোট পেয়ে ১৪৬টি (৪৮.৬৬%) আসন লাভ করে, বিএনপি ৩৩.৬৩% ভোটে ১১৬টি (৩৮.৬৬%) আসন পায়। ভোটের পার্থক্য ছিল ৩.৮১%, আসনের পার্থক্য ছিল ৩০টি (১০%)।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট (৪০.৯৭%) এবং আওয়ামী লীগের (৪০.১৩%) ভোটের পার্থক্য মাত্র ০.৮৪%, কিন্তু আসনের পার্থক্য ছিল বিশাল। বিএনপি জোট আসন পেয়েছিল ১৯৩টি (৬৪.৩৩%), আওয়ামী লীগ মাত্র ৬২টি (২০.৬৬%)। আসনের পার্থক্য ছিল ১৩১টি (৪৩.৬৭%)।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৮% ভোটে ২৩০টি (৭৬.৬৬%) আসন পায়, বিএনপি ৩৩% ভোট পেলেও মাত্র ২৯টি (৯.৬৬%) আসন পায়। ভোটের পার্থক্য ১৫%, আসনের পার্থক্য ছিল ২০১টি (৬৭%)।

এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ভোট শতাংশের তুলনায় আসন সংখ্যায় বিশাল পার্থক্য বাংলাদেশে একটি সাধারণ বিষয়। এই পার্থক্য জনগণের প্রকৃত মতামতের যথাযথ প্রতিফলনকে বাধাগ্রস্ত করে।

🌐 বিশ্বের শীর্ষ ১৫ ভোটার সংখ্যার দেশের তুলনা: বাংলাদেশ ব্যতিক্রম

বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি, যা বিশ্বের ৫ম সর্বোচ্চ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, শীর্ষ ১৫টি ভোটার সংখ্যার দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যাদের একক-কক্ষবিশিষ্ট (Unicameral) সংসদ রয়েছে। বাকি ১৪টি দেশেই রয়েছে দুই-কক্ষবিশিষ্ট (Bicameral) সংসদ, যা তাদের আইন প্রণয়ন এবং প্রতিনিধি কাঠামোকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে।

নীচে তালিকাভুক্ত করা হলো শীর্ষ ১৫টি দেশের তথ্য:

ক্রমদেশভোটার সংখ্যা (প্রায়)সংসদীয় কাঠামো
ভারত৯৭.৮ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
ইন্দোনেশিয়া২০.৫ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
যুক্তরাষ্ট্র১৮.৬ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
ব্রাজিল১৫.০ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
বাংলাদেশ১২.০ কোটি❌ এক-কক্ষবিশিষ্ট
পাকিস্তান১২.৭ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
রাশিয়া১১.০ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
মেক্সিকো১০.০ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
জাপান৯.২ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
১০জার্মানি৮.৯ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
১১ফিলিপাইন৬.৭৫ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
১২ফ্রান্স৪.৮ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
১৩যুক্তরাজ্য৪.৭ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট
১৪তুরস্ক৫.০–৫.৫ কোটি❌ এক-কক্ষবিশিষ্ট
১৫দক্ষিণ আফ্রিকা২.৬ কোটি✅ দুই-কক্ষবিশিষ্ট

🌐 বিশ্বের শীর্ষ ভোটার সংখ্যার দেশগুলোর Bicameral ব্যবস্থা গ্রহণের ইতিহাস:

দেশরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাদুই-কক্ষ চালুক’ বছরে চালুবিপ্লব/কারণ
ভারত১৯৪৭ (স্বাধীনতা)১৯৫০৩ বছরস্বাধীনতার পর নতুন সংবিধান
ইন্দোনেশিয়া১৯৪৫২০০৪৫৯ বছরগণতান্ত্রিক সংস্কার, সুহার্তোর পতনের পর
যুক্তরাষ্ট্র১৭৭৬ (স্বাধীনতা)১৭৮৯১৩ বছরসংবিধান রচনার মাধ্যমে, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর
ব্রাজিল১৮৮৯ (প্রজাতন্ত্র)১৮৮৯একই বছররাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর
বাংলাদেশ১৯৭১❌ নেইএখনো গৃহীত হয়নি
পাকিস্তান১৯৪৭১৯৭৩২৬ বছরনতুন সংবিধানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
রাশিয়া১৯৯১ (সোভিয়েত পতন)১৯৯৩২ বছরসোভিয়েত পতনের পর নতুন কাঠামো
মেক্সিকো১৮২১ (স্বাধীনতা)১৮২৪৩ বছরযুক্তরাষ্ট্রের অনুকরণে কংগ্রেস গঠন
জাপান১৮৬৮ (মেইজি যুগ)১৯৪৭৭৯ বছরWWII-পর মার্কিন প্রভাব ও নতুন সংবিধান
জার্মানি১৮৭১ (একত্রীকরণ)১৯৪৯৭৮ বছরWWII-পর ফেডারেল কাঠামো গঠন
ফিলিপাইন১৯৪৬ (স্বাধীনতা)১৯৮৭৪১ বছরমার্কোস পতনের পর নতুন সংবিধান
ফ্রান্স১৭৮৯ (বিপ্লব)১৯৫৮১৬৯ বছরপঞ্চম প্রজাতন্ত্রের সময় স্থিতিশীল কাঠামো প্রতিষ্ঠা
যুক্তরাজ্যপ্রাচীনকালধাপে ধাপেশতাব্দীর পর শতাব্দীধাপে ধাপে বিবর্তন; হাউস অব লর্ডস প্রাচীন
তুরস্ক১৯২৩❌ (১৯৮২ থেকে এক কক্ষ)সামরিক অভ্যুত্থানে সিনেট বাতিল
দক্ষিণ আফ্রিকা১৯৯৪ (গণতন্ত্র)১৯৯৬২ বছরবর্ণবাদের পতনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান

🏛️ দুই-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ: স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক কার্যকর প্রতিরোধ


🔒 স্বৈরতন্ত্র কী?

স্বৈরতন্ত্র (Authoritarianism) হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে সব ধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতা একজন ব্যক্তি বা একটি দলের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।

  • তারা আইনের মাধ্যমে নয়, নিজেদের ইচ্ছেমতো দেশ চালায়।
  • আদালত, পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, এমনকি মিডিয়াও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
  • বিরোধী দল, সাধারণ জনগণের মতামত বা আন্দোলন—সবকিছুই দমন করা হয়।

📌 ফলাফল:
– জনগণের ভোটের মানে থাকে না।
– আইন হয় একতরফা।
– স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে দেশ চলে।


⚖️ দুই-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ (Bicameral Legislature) কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে?

একটি সংসদ যদি দুইটি কক্ষে বিভক্ত হয়—একটি প্রথম কক্ষ (Lower House) এবং একটি দ্বিতীয় কক্ষ (Upper House)—তবে এটি স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে সহজে আটকে রাখতে পারে।

✅ প্রথম কক্ষ (Lower House):

  • সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়।
  • সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এখানেই বেশি আসন পায়।
  • আইন প্রস্তাব (bill) এখান থেকেই আসে।

👉 যদি কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়, তারা ইচ্ছেমতো আইন পাশ করতে পারে—এখানেই বিপদের আশঙ্কা থাকে।

✅ দ্বিতীয় কক্ষ (Upper House):

  • এই কক্ষে সদস্যরা বিভিন্ন উপায়ে আসেন—
    – অঞ্চলভিত্তিক প্রতিনিধি (যেমন যুক্তরাষ্ট্রে সিনেট)
    – সংখ্যালঘু বা পেশাজীবীদের মনোনয়ন
    – কখনো নির্বাচন, কখনো মনোনয়ন, কখনো মিশ্র পদ্ধতি
  • তাদের কাজ হলো:
    – প্রস্তাবিত আইন খুঁটিয়ে দেখা
    – সংবিধান বা জনস্বার্থবিরোধী হলে সংশোধন বা বাতিল করা
    – জাতীয় স্বার্থে ভারসাম্য রক্ষা করা

🛡️ ফলে, যদি একটি কক্ষ ভুল বা স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নেয়, দ্বিতীয় কক্ষ সেটি আটকে দিতে পারে।


🧠 বিখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি

১. মঁতেস্কিয়ু (Montesquieu) – ফ্রান্স, ১৭৪৮

📘 বই: The Spirit of the Laws

  • তিনি বলেন, “ক্ষমতার বিভাজন না থাকলে স্বৈরতন্ত্র জন্ম নেয়।
  • আইন প্রণয়ন, বিচার এবং শাসন – এই তিনটি ক্ষমতা যদি এক জায়গায় থাকে, তাহলে রাষ্ট্র স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে পড়ে।
  • দুই-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ এই শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য আনে।

২. জন লক (John Locke) – ইংল্যান্ড

  • তিনি বলেন, “যখন একটি গোষ্ঠী বা ব্যক্তি সব সিদ্ধান্ত নেয়, তখন জনগণের স্বাধীনতা থাকে না।
  • দুই কক্ষে বিভিন্ন শ্রেণি, মত, অঞ্চল বা পেশার মানুষ থাকার ফলে, স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত সহজে বাধা পায়।

৩. জেমস ম্যাডিসন (James Madison) – যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানপ্রণেতা

📘 The Federalist Papers

  • তাঁর বিখ্যাত উক্তি:
    “If men were angels, no government would be necessary.”
  • অর্থাৎ, মানুষ ভুল করে, তাই সঠিক ব্যবস্থাপনা দরকার।
  • তিনি বিশ্বাস করতেন দুই কক্ষ থাকা মানে একটি কক্ষ অন্যটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে—check and balance system

✅ বাস্তব উদাহরণ

দেশদুই-কক্ষ ব্যবস্থালক্ষ্য
যুক্তরাষ্ট্রহাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস (নিম্ন কক্ষ) এবং সিনেট (উচ্চ কক্ষ)কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য স্বার্থ রক্ষা
ভারতলোকসভা (নিম্ন কক্ষ) এবং রাজ্যসভা (উচ্চ কক্ষ)জনসাধারণ ও রাজ্যগুলোর স্বার্থের ভারসাম্য
জার্মানিবুন্ডেসটাগ ও বুন্ডেসর‌্যাটআইন প্রণয়নে রাজ্যগুলোর মতামত যুক্ত করা

✅ উপসংহার:

এই তালিকা স্পষ্ট করে দেয় যে, বড় ভোটারভিত্তিক দেশে দুই-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও বৃহৎ ভোটারভিত্তিক দেশে একটি মাত্র কক্ষে ভোট শতাংশ অনুযায়ী আসনের অসামঞ্জস্যতা গণতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক রীতি ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, ভোটারের প্রকৃত মতামত প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশেও দুই-কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা উচিত।

দুই-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ মানে শুধু আইন পাসের ধাপ বাড়ানো নয়—এটি গণতন্ত্রের নিরাপত্তা বলয়
এটি স্বৈরাচার ঠেকায়, মতের বৈচিত্র্য রক্ষা করে, এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

📌 বাংলাদেশে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ হওয়ায়, যখন কোনো দল এককভাবে ক্ষমতায় থাকে, তখন আইন পাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণ সবই তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়—যা গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই ভবিষ্যতের জন্য দুই কক্ষ নিয়ে ভাবা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *