সম্প্রতি (April 2025) মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা নাগরিকের মধ্যে ১,৮০,০০০ জনকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আমি ইন্টারনেটে বিভিন্ন গবেষণা পত্র পর্যালোচনা করছিলাম। তখনই মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল-আলম এবং হেলাল উদ্দিন কর্তৃক রচিত গবেষণা পত্রটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এই গবেষণা পত্রে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা সংকট, নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সমাধানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করা হয়েছে, যা আমার কাছে অত্যন্ত তথ্যবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
তাই, আমি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে গবেষণা পত্রটির একটি বাংলা অনুবাদ সংস্করণ তৈরি করেছি।
এই অনুবাদটি মূল গবেষণার বিষয়বস্তু অবিকৃত রেখে, সাধারণ পাঠকের বোধগম্যতার জন্য সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে কেউ—বিশেষ করে তরুণ বা সাধারণ নাগরিকরাও—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে পারেন।
মূল গবেষণা পত্রটি প্রকাশ করেছে:
Research & Innovation Initiative Inc.,
যা Michigan Department of Licensing & Regulatory Affairs, United States-এ রেজিস্ট্রেশন নম্বর 802790777-এর মাধ্যমে নিবন্ধিত।
এই গবেষণা পত্রটি ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে এবং আমি এটি সংগ্রহ করি ResearchGate ওয়েবসাইট থেকে, যেখানে এটি বিনামূল্যে এবং কোনো অ্যাকাউন্ট ছাড়াই ডাউনলোড করার সুযোগ ছিল।
মূল গবেষণাটি ডাউনলোড করার লিংক:
এই অনুবাদ সংস্করণের সঙ্গে মূল লেখকদ্বয়ের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা নেই।
এটি শুধুমাত্র একটি শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। আমি অনুবাদ উপস্থাপনের সময় মূল লেখকদের নাম, গবেষণা পত্রের শিরোনাম, প্রকাশনার উৎস এবং মূল লিংক যথাযথভাবে উল্লেখ করেছি, যা পাঠকরা মূল উৎস থেকে যাচাই করে নিতে পারবেন।
আমি আশা করি, এটি সচেতন নাগরিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাস্তবধর্মী ধারণা দিতে সহায়ক হবে এবং সীমান্ত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আলোচনায় পাঠকদের সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করবে।
গবেষণা সারসংক্ষেপ:
বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে তার সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যার মধ্যে রয়েছে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে সীমান্তবর্তী অপরাধ। রোহিঙ্গা আগমন এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এই চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও ঘনীভূত করেছে। বর্তমান গবেষণার উদ্দেশ্য হলো সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বহুমাত্রিক আন্তঃসীমান্ত বিষয়গুলো এবং জাতীয় নিরাপত্তার উপর তাদের পরিণতি অনুসন্ধান করা, এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্থল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য প্রাসঙ্গিক ও কৌশলগত সমাধান উপস্থাপন করা।
এই গবেষণায় গুণগত গবেষণার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা বর্ণনামূলক প্রকৃতির, এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জটিলতা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে।
এই গবেষণার জন্য বিভিন্ন উৎসের ভিত্তিতে থিম্যাটিক বিশ্লেষণ পরিচালনা করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন: অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, মাদক পাচার, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, রোহিঙ্গা আগমন, সীমান্ত অপরাধ, অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা, দারিদ্র্য ইত্যাদি।
এই ধরনের চ্যালেঞ্জ আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া, এগুলো বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি।
রোহিঙ্গাদের সফল প্রত্যাবাসনের জন্য সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, সীমান্ত অবকাঠামোর উন্নয়ন, সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এই অব্যাহত চ্যালেঞ্জগুলোর কৌশলগত সমাধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়ন কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারে।
১. ভূমিকা
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি জটিল বিষয়, যা বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক হুমকি কমিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বাড়াতে হলে, একটি দেশের সব সংশ্লিষ্ট পক্ষের সম্মিলিত ও অংশগ্রহণমূলক প্রচেষ্টা প্রয়োজন (Ehsan, 2023)। বাংলাদেশ দুটি দেশের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নেয়, তার একটি হলো মিয়ানমার। যদিও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বহু আগেই শুরু হয়েছে, বর্তমান সম্পর্ক এমন না যে একে খুব খারাপ বলা যায়, আবার খুব ভালোও বলা যায় না।
এই সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণে, যেমন রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ, সীমান্তবর্তী বিদ্রোহী তৎপরতা এবং স্থল সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সমস্যাসমূহ (Chowdhury, 2017)।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তকে অনিশ্চিত ও কঠিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ এখানে জাতিগত উত্তেজনা, জটিল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা এবং সহজে পেরোনো যায় এমন সীমান্ত রয়েছে।
সম্প্রতি মিয়ানমারের সরকার বাহিনী এবং সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় (Rahman, 2024)।
এই প্রেক্ষাপটে, বর্তমান গবেষণাটি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জটিল দিকগুলো বিশ্লেষণ করতে চায়, যেখানে বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়া বহুমুখী চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে, এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক দিকগুলো বুঝে কার্যকর সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই গবেষণাটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জটিলতা বোঝাতে সহায়তা করে এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ প্রদান করে।
সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতে এই প্রবন্ধটি নিচেরভাবে সাজানো হয়েছে:
- পরবর্তী অংশে সমস্যা নির্ধারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
- এরপর রয়েছে গবেষণার পদ্ধতিগত অংশ, যেখানে বিষয়গুলো বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহৃত গবেষণা কৌশল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
- এরপর আলোচনা করা হয়েছে বাংলাদেশে বর্তমান সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সার্বিক চিত্র।
- এরপরে রয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্লেষণ, যা এই এলাকার বিশেষ চ্যালেঞ্জগুলোর কারণ তুলে ধরে।
- তারপর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যেসব নির্দিষ্ট সমস্যা দেখা দেয়, সেগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
- এরপর কিছু সম্ভাব্য সমাধানের পথ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সীমান্ত শাসনব্যবস্থাকে উন্নত করতে সাহায্য করবে।
- প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে গবেষণার সারসংক্ষেপ ও ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য কিছু দিকনির্দেশনার মাধ্যমে।
২. সমস্যার বিবরণ
মিয়ানমার দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব এশিয়ার মিলনস্থলে একটি ভৌগোলিক সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। এর পশ্চিম পাশে মাত্র ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত বাংলাদেশ সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে (Ahmed, 2015; Alam, 2018; Khan, 2016; Sheikh, 1998)। তবে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার এই সীমান্তটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ও সহজে পার হওয়া যায় এমন (porous) হিসেবে চিহ্নিত।
রাখাইন রাজ্যের জাতিগত সহিংসতার প্রভাব এই সীমান্ত এলাকায় বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে এবং উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে (Shikha, 2014)। তাছাড়া, এই সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক গঠনও কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বহু সমস্যার সৃষ্টি করে।
বর্তমান গবেষণাগুলোর অধিকাংশই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করে থাকে, যেমন Rahman (2023), Khanam & Ali (2022), Nesa (2022), Ahamed et al. (2020), এবং Parnini (2013)-এর গবেষণাগুলোতে দেখা যায়। যদিও এই গবেষণাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেছে, তবুও বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জটিলতা বোঝার ক্ষেত্রে এখনো একটি বড় শুন্যতা রয়ে গেছে।
বর্তমান গবেষণাগুলোতে বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে সহজে পার হওয়া যায় এমন সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যে বিশেষ ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা অনেকাংশেই উপেক্ষিত হয়েছে। তাই, এই গবেষণাটি সেই শূন্যস্থান পূরণ করার চেষ্টা করছে।
৩. গবেষণা পদ্ধতি
এই গবেষণায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বহুমাত্রিক ও জটিল দিকগুলো বুঝতে গুণগত (qualitative) গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণাটি বর্ণনামূলক (descriptive) প্রকৃতির এবং এতে নথিপত্র বিশ্লেষণের (document analysis) ভিত্তিতে দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো অনুসন্ধান করা হয়েছে এবং এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এছাড়া, এই গবেষণায় সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক প্রবন্ধ ও গবেষণা কাজগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে, যাতে বিষয়গুলোকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়।
এই গবেষণার জন্য তথ্য খোঁজার একটি পরিকল্পিত পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে সরকারের নথি, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন, একাডেমিক গবেষণাপত্র এবং স্বীকৃত সংবাদ উৎসগুলোর মতো সহজলভ্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তথ্য খোঁজার সময় এমন কী-ওয়ার্ড (search keyword) ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক, আন্তঃসীমান্ত কার্যক্রম, শরণার্থী আগমন ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
সংগ্রহ করা তথ্য থিম অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা হয়েছে (thematic analysis), যাতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও প্রবণতাগুলো চিহ্নিত করা যায়।
এই গবেষণা নৈতিক মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে। এতে তথ্যের গোপনীয়তা ও মেধাস্বত্ব (intellectual property rights) সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। তবে গবেষণায় যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন—দ্বিতীয় উৎস (secondary data) ব্যবহার করায় বাস্তবসম্মত তাৎক্ষণিক তথ্যের অভাব এবং সম্ভাব্য পক্ষপাতদুষ্টতা—তা স্বীকার করা হয়েছে।
৪. বাংলাদেশে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার মধ্যে দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকি অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ স্থলসীমান্তে (৪,২৪৬ কিলোমিটার) ভারত (পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব পাশে) এবং মিয়ানমার (দক্ষিণ-পূর্ব পাশে) এর সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে ৯৩.৯% এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ৬.১% সীমান্ত রয়েছে। সমুদ্রসীমান্ত (৫৮০ কিলোমিটার) দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত (Banglapedia, 2021)।
সীমান্ত এলাকার জনসংখ্যা ঘনবসতিপূর্ণ এবং উভয় পাশের মানুষ প্রায় প্রতিটি ইঞ্চি জমি ব্যবহার করে। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও অনেকটা মিল থাকায় আলাদা করে চেনা কঠিন। এই এলাকাগুলোর ব্যবস্থাপনা কঠিন, কারণ এখানে সীমান্ত সহজে পেরোনো যায় (porous), জটিলতা বেশি, সচেতনতা কম, জীবনযাপন কষ্টকর এবং চাকরির সুযোগ সীমিত (Alam, 2023)।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) হলো দেশের স্থল ও সমুদ্রসীমান্ত রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান আধাসামরিক বাহিনী। তারা সীমান্ত রক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, নারী ও শিশু পাচার রোধ, মাদক পাচার এবং সকল ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করে।
এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠার ২২৮ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে এর কাজের পরিধি ও দক্ষতা অনেকগুণ বেড়েছে। এই বাহিনী ১৭৯৫ সালে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ নামে যাত্রা শুরু করে, যা তার আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ১৭৯৪ সালে গঠিত ‘Frontier Protection Force’ ছিল। প্রতিষ্ঠার সময় বাহিনীতে ছিল দুটি অপ্রাতিষ্ঠানিক অশ্বারোহী দল, ৪৪৮ জন সৈন্য ও ৪টি কামান।
১৮৬১ সালে বাহিনী পুনর্গঠিত হয়ে ‘Frontier Guards’ নাম ধারণ করে, যার সদস্য সংখ্যা ছিল ১৪৫৪। ১৮৯১ সালে এটি ‘Bengal Military Police’ নামে পরিচিত হয়। ভারত বিভাজনের পর, ১৯৪৭ সালে বাহিনীটির নাম হয় ‘East Pakistan Rifles (EPR)’, এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ এটি ‘Bangladesh Rifles (BDR)’ নামে পরিচিত হয় (BGB, 2023)।
২০১০ সালে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন (৬৩ নং আইন, ২০১০)’ পাস হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাইফেলস (BDR) পুনর্গঠন করে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)’ নামক আধাসামরিক বাহিনী গঠন, নিয়ন্ত্রণ, শাসন এবং ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবস্থা করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তঃদেশীয় সীমান্ত অপরাধ রোধ করা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা (Halim, 2021)। বর্তমানে বাহিনীটি এই নতুন আইনের আলোকে তার সংগঠন পুনর্গঠন করছে। বর্তমানে বাহিনীটি ৫টি অঞ্চল, ১৬টি সেক্টর এবং অসংখ্য বর্ডার আউটপোস্ট (BOP) এর মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে (BGB, 2023)।
BGB ছাড়াও বাংলাদেশে কিছু অন্যান্য সংস্থা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। যেমন:
- বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দেশের উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
- বাংলাদেশ কাস্টমস ২৪টি স্থল কাস্টমস পোর্টের মাধ্যমে বৈধ রপ্তানি ও আমদানি কার্যক্রম তদারকি করে এবং শুল্ক আদায় করে, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর অধীনে পরিচালিত।
- অভিবাসন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে, দেশের মানুষের বৈধভাবে প্রবেশ ও প্রস্থানের তদারকি করে।
- বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) সীমান্তে অর্থ পাচার প্রতিরোধে কাজ করে।
- বাংলাদেশ পুলিশ সীমান্ত চেকপোস্টে এবং অন্যান্য বিশেষ সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্ত নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে (Ahmed, n.d.)।
৬. বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
এই অংশে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
৬.১ অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য
সীমান্ত এলাকার মানুষদের জীবিকার সুযোগ সীমিত হওয়া এবং এসব দূরবর্তী এলাকার নিজ নিজ দেশের সঙ্গে দুর্বল সংযোগ থাকার কারণে সীমান্ত অঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য বা চোরাপথে বাণিজ্য প্রচলিত রয়েছে (Ahmed, 2020)।
ভারতীয় উপমহাদেশের সীমান্তগুলোতে চোরাচালান বা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য সাধারণত বিদ্যমান থাকে, যদিও তা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন মাত্রায় ঘটে। বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যকার সীমান্তও চোরাচালানের এই চিত্র থেকে মুক্ত নয় (Alam, 2023)।
এই চোরাচালান বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর জন্য বহুস্তর বিশিষ্ট সমস্যা সৃষ্টি করে। কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেও চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না। প্রতিরাতেই চোরাচালান চক্র সীমান্ত পাহারাদারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন অবৈধ পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে নিয়ে আসে।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গড়ে ওঠা শক্তিশালী চক্র এসব চোরাকারবারিদের সঙ্গে মিলেমিশে এই কাজে জড়িত রয়েছে (Daily Jugantor, 2019)।
টেবিল ০১: চোরাচালান পণ্যের জব্দ মূল্য (২০১৯ – ২০২৩)
| বছর | আগত পণ্যের জব্দ মূল্য (৳) | বহির্গামী পণ্যের জব্দ মূল্য (৳) | মোট জব্দ মূল্য (৳) |
| ২০১৯ | ২৫১,৩৩,৪০,০৭৭ | ৩৬,৬০,৬৯,৭৫৫ | ২৮৭,৯৪,০৯,৮৩২ |
| ২০২০ | ৩৩৮,৫৭,৯৬,৬৬৫ | ৩,৪৪,৮৬,৬৭৩ | ৩৪২,০২,৮৩,৩৩৮ |
| ২০২১ | ৫৪৯,৭৪,০৪,০৮০ | ১৩,২২,০০,১৬১ | ৫৬২,৯৬,০৪,২৪১ |
| ২০২২ | ১৮৭,৩৭,৯০,০৫০ | ২২,৭৫,২৯,৮৪২ | ২১০,১৩,১৯,৮৯২ |
| ২০২৩ | ১২২১,৫০,৯২,৭২২ | ৫৪,৩৮,৯৬৭ | ১২২২,০৫,৩১,৬৮৯ |
| মোট | ২৫৪৮,৫৪,২৩,৫৯৪ | ৭৬,৫৭,২৫,৩৯৮ | ২৬২৫,১১,৪৮,৯৯২ |
Source: BGB HQ (2024)
(১ টাকা ≈ ০.০০৮৩ মার্কিন ডলার)
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া পণ্য হলো মাদকদ্রব্য। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা UNODC ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, মিয়ানমার দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান মাদক উৎপাদনকারী দেশ (Dewan, 2017)।
এই দেশের অবৈধ মাদক বাজারে মেথামফেটামিন (ইয়াবা) এবং আফিম প্রাধান্য বিস্তার করে, যা মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং সহজে পার হওয়া যায় এমন সীমান্ত থাকার কারণে দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় অনেক মানুষ ইয়াবা ব্যবসায় সক্রিয়ভাবে জড়িত, এবং এই ব্যবসা থেকে বিপুল অর্থ উপার্জন করে অনেকেই কোটিপতি হয়ে উঠেছে (Ahamed et al., 2020)।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “মিয়ানমার সেনাবাহিনী ইয়াবা এবং ক্রিস্টাল মেথ তৈরি এবং তা বাংলাদেশে পাচারে সরাসরি জড়িত”।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গারাও মাদক পাচারে জড়িত রয়েছে (The Business Standard, 2022)।
টেবিল ০২: অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার (২০১৯–২০২৩
| বছর | রাইফেল (টি) | রিভলভার (টি) | পিস্তল (টি) | বন্দুক (সব ধরনের) | গুলি (সব ধরনের) | ম্যাগাজিন (টি) |
| ২০১৯ | – | – | ০১ | ৩০ | ৫৬ | ০১ |
| ২০২০ | – | – | ০১ | ৫৬ | ২১৫ | ০১ |
| ২০২১ | – | ০১ | ০১ | ১৪ | ০৩ | – |
| ২০২২ | ০৫ | – | ০৫ | ৩৮ | ১৬ | – |
| ২০২৩ | – | – | ০৩ | ০৩ | ৪৫ | – |
| মোট | ০৫ | ০১ | ১১ | ১৪১ | ৩৩৫ | ০২ |
উৎস: HQ BGB (2024)
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মাদকদ্রব্যের পাশাপাশি অস্ত্রও একটি সাধারণভাবে পাচার হওয়া পণ্য।
কক্সবাজারে অবৈধ অস্ত্র পাচারের ইতিহাস ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে নথিভুক্ত হয়েছে এবং এখনও তা চলছে, বিশেষ করে শরণার্থী সংকটের কারণে এই অঞ্চলে অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অস্ত্র পাচারের একটি কৌশলগত পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেখান থেকে অস্ত্র ভারতের ও নেপালের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় (Gutberlet, 2020)।
চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সংযোগ ব্যবহার করে, পাচারকারীরা গোপন বাজারে অস্ত্র বেচাকেনায় লিপ্ত হয় (Rashid et al., 2020)।
তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো—যারা নির্বাচনী সহিংসতায় অস্ত্র ব্যবহার করে এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানকারী অপরাধী গোষ্ঠী। এই অস্ত্র পাচারকারী চক্রগুলো প্রায়ই লাইসেন্সধারী অস্ত্র ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং কিছু জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ মাদক বহনকারী হিসেবে তাদের সহায়তা করে (Khan, 2021)।
অস্ত্র ও মাদকের পাশাপাশি, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে গরু, মহিষ, খাদ্যদ্রব্য, সিগারেট ইত্যাদিও চোরাচালান হয়। অপরদিকে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে মিয়ানমারে জ্বালানি, রান্নার তেল এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য চোরাপথে পাঠানো হয় (Rashid, 2024)।
টেবিল ০৩: BGB কর্তৃক আটককৃত মাদক ও নেশাজাত দ্রব্য (২০১৯–২০২৩)
| বছর | ফেনসিডিল (বোতল) | মদ (বোতল) | হেরোইন (কেজি) | গাঁজা (কেজি) | ইয়াবা (টি) | ক্রিস্টাল মেথ/আইস (কেজি) | বিয়ার (বোতল) |
| ২০১৯ | ২৯০ | ৭৬৫ | – | ১৪.৪০০ | ৮০,০০,১৪৭ | – | ১৩০৫ |
| ২০২০ | ২৩৪ | ৬৩৪ | – | ১০.৫৩০ | ১,০৪,০৭,৯৩৫ | – | ৩২০২ |
| ২০২১ | ১৬৬ | ১৯৬৩ | – | ২২.০৪৫ | ১,৫৪,০৯,১৫২ | ১১.৯০০ | ৫৫৭৮ |
| ২০২২ | ১২৫ | ৭৯৭৪ | – | ৩০.০৬০ | ১,০৭,১৩,৩৬৫ | ৭৭.৬১৫ | ১৭৯৩০ |
| ২০২৩ | ১৭১ | ১৬,৫০৯ | ৩০.০৮১ | ৪২.০৮৩ | ১,২২,৭৬,২৭৫ | ১৪২.৩৯২ | ৪৮৩৭৭ |
| মোট | ৯৮৬ | ২৭,৮৪৫ | ৩০.০৮১ | ১১৯.১১৮ | ৫,৬৮,০৬,৮৭৪ | ২৩১.৯০৭ | ৭৬,৩৯২ |
উৎস: BGB HQ (2024)
অবৈধ মাদক ও অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্যের প্রবাহ বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
বিশেষ করে বাংলাদেশ এই ধরনের অবৈধ দ্রব্যের চোরাচালান বন্ধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় (Munir, 2020)।
মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের ওপর এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
এই ধরনের অবৈধ কাজে যারা জড়িত, তাদের মধ্যে ন্যূনতম নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
এতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে (Alam, 2023)।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার যৌথভাবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অস্ত্র চোরাচালান বন্ধে সহযোগিতায় না এলে, অপরাধী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে (Rashid et al., 2020)।
৬.২ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা
মিয়ানমার একটি স্বৈরাচারী সামরিক শাসিত দেশ, যেখানে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রতি খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশটিতে নাগরিক অধিকার দমন করার জন্য পরিকল্পিতভাবে দমনমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় (Manurung, 2021)।
দীর্ঘ সময় ধরে মিয়ানমারে কঠোর সামরিক শাসন, চরম দারিদ্র্য এবং জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘাত চলছে। ২০১১ সালে পূর্ণ সামরিক শাসন থেকে আংশিক পরিবর্তনের ফলে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আশার জন্ম হয়। তবে, তখনকার সরকার সামরিক বাহিনীর ব্যাপক প্রভাবাধীন ছিল।
২০১৫ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী আউং সান সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (NLD) সংসদের উভয় কক্ষেই বড় জয় পায়। কিন্তু এরপরও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাতমাদাও দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ধরে রাখে।
তবে সামরিক এবং বেসামরিক উভয় নেতারাই বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হন রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর রাখাইন রাজ্যে চালানো নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে (Maizland, 2022)।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী ফের অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকারকে সরিয়ে দেয় এবং দেশের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলে গণতান্ত্রিক অগ্রগতির সব আশা ভেঙে পড়ে।
এর প্রতিবাদে বিরোধীরা একটি ছায়া সরকার গঠন করে এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে, যা একটি গৃহযুদ্ধ এবং মানবিক সংকটের দিকে নিয়ে যায়, যার প্রভাব মিয়ানমারের সীমান্তের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে (Maizland, 2022)।
মিয়ানমারের ইতিহাসে সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে এমন ব্যাপক প্রতিরোধ আগে কখনও দেখা যায়নি।
আরাকান আর্মি, কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি (KIA) এবং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি মিলে ‘থ্রি ব্রাদার্স অ্যালায়েন্স’ গঠন করেছে; এর মধ্যে manpower অনুযায়ী আরাকান আর্মি সবচেয়ে প্রভাবশালী (M. S. Hossain, 2024a)।
সামরিক বাহিনী এই প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নির্মমভাবে দমন করছে, সাধারণ মানুষের এলাকায় বোমা হামলা চালিয়ে বেসামরিক লোকজনের মৃত্যু ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে, থ্রি ব্রাদার্স অ্যালায়েন্স কৌশলগত অঞ্চলগুলো—যেমন চিন রাজ্য, উত্তর শান রাজ্য এবং রাখাইন রাজ্য—দখল করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, যেগুলো বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এই সংঘর্ষের প্রভাব টের পাচ্ছে, সীমান্ত অঞ্চলে গুলির শব্দে মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি এবং সামরিক জান্তার মধ্যে সংঘর্ষ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মর্টার শেল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে পড়ছে এবং এতে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে ও আহত হচ্ছে।
এই যুদ্ধ থেকে পালিয়ে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (BGP)-এর অনেক সদস্য অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, কারণ বিদ্রোহীরা আরও অঞ্চল দখল করে নিচ্ছে।
এই সংঘাতের বহুমুখী প্রভাব পড়বে—জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক দিকগুলোতে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা এসব সীমান্ত-পারাপার সংঘাতের কারণে ক্রমেই আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে (Tayeb, 2024)।
৬.৩ রোহিঙ্গা আগমন
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরাকানে বসবাস করছে। তারা মূলত মুসলিম ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে আখ্যায়িত করে।
রোহিঙ্গারা যে অমানবিক ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের মুখোমুখি, তা শুধু বর্তমান কিংবা সদ্য বিদায়প্রাপ্ত সামরিক শাসকদের দ্বারা নয়, বরং এর একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। এই নিপীড়নের ইতিহাস নতুন কিছু নয়, বরং তা শত বছরের পুরোনো (Chowdhury, 2023)।
১৯৪৮ সাল থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন সরকার ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
এই অভিযানে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী জোরপূর্বক রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত করেছে, তাদের মসজিদ ধ্বংস করেছে, ব্যাপক লুটপাট এবং নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা চালিয়েছে।
এই নিরবচ্ছিন্ন নির্যাতনের ফলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যত্র শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে (Kader & Choudhury, 2019)।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোহিঙ্গা জনগণের আগমনের ছয়টি (বা ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের ঘটনাগুলো আলাদাভাবে ধরলে সাতটি) বড় সময়কাল রয়েছে। এই সময়গুলো হলো: ১৭৮০-এর দশক (১৭৮৪), ১৯৪০-এর দশক, ১৯৭৮, ১৯৯১–১৯৯২, ২০১২, এবং সর্বশেষ ২০১৬ ও ২০১৭ সাল।
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া ব্যাপক আগমন কোনো হঠাৎ করে ঘটানো ঘটনা বা রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার ফলাফল নয়।
বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, যেখানে ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালের ARSA-র হামলা সেই পরিকল্পনা কার্যকর করার একটি বড় সুযোগ তৈরি করে (Mollick, 2023)।
২০১৭ সালের আগস্ট থেকে যে ব্যাপক আগমন শুরু হয়েছে, তাতে প্রায় ৯৭১,৯০৪ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৯৩৯,৩৩৪ জন রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য ২০১৮, ২০১৯ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তারা প্রত্যাবর্তনে নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় তা ব্যর্থ হয়েছে (Palma & Molla, 2024)।
রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ দেশটি আগে থেকেই ঘনবসতিপূর্ণ।
মিয়ানমার থেকে নিরবচ্ছিন্ন শরণার্থী প্রবেশ বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, কারণ তাদের বসবাস, খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন দায়িত্ব নিতে হচ্ছে (Babu, 2020)।
রোহিঙ্গা আগমনের বহু সমস্যার পাশাপাশি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এই সংকট বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা, অস্থিরতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে।
মিয়ানমারের দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অপেশাদার নিরাপত্তা বাহিনী বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে (Chowdhury, 2023)।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের কারণে তাদের ব্যাপক হারে বাংলাদেশে আগমনে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রচণ্ড চাপে পড়েছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘ, সহজে পেরোনো যায় এমন (porous) সীমান্ত দিয়ে এই শরণার্থী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় বিপুল সংখ্যক শরণার্থী থাকার কারণে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ চাপে পড়েছে। বাস্তবতা হলো, এই শরণার্থী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত জনবল, সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর প্রয়োজন।
৬.৪ সীমান্তবর্তী অপরাধ
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে সীমান্তবর্তী অপরাধ একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, যা বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাগত প্রভাব ফেলছে।
এই অঞ্চলের সীমান্ত অপরাধের মধ্যে রয়েছে: মানুষ, প্রাণী ও মাদক পাচার, চোরাচালান, সন্ত্রাসবাদ/চরমপন্থা এবং পরিবেশবিষয়ক অপরাধ।
তবে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সংঘটিত বেশিরভাগ অপরাধ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে জড়িত।
রোহিঙ্গারা মাদক পাচার, চুরি, হত্যাকাণ্ড, মিথ্যা জাতীয়তা দাবি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করার মতো বিভিন্ন সীমান্ত অপরাধে জড়িত (Khan, 2022)।
টেবিল ০৪: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ
| অপরাধের ধরন | অংশগ্রহণকারী (%) |
| চুরি (Theft) | ৫৩% |
| ছিনতাই (Snatch) | ১৭% |
| ডাকাতি (Robbery) | ৪% |
| মাদক সরবরাহ (Drug supply) | ৭৭% |
| চোরাচালান (Smuggling) | ৭৭% |
উৎস: Hoque et al. (2021)
Hoque et al. (2021)-এর এক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মাদক পাচার, চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িত।
একাধিক স্থানীয় সংবাদপত্রেও রোহিঙ্গাদের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপরাধ ও দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বিজিবি ও পুলিশের চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও, রোহিঙ্গারা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় মাদক পাচার ও চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ছে। তারা পাহাড়ি বনাঞ্চলের গোপন রাস্তা ব্যবহার করে বাধা এড়িয়ে চলাচল করে।
এছাড়াও, বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠী প্রায়ই জাতিগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় (Yasmin, 2017)।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের দুর্বিষহ জীবনযাপন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব—এই সবকিছু মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধমূলক আচরণ বেড়ে গেছে।
বারবার প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তারা আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, যা মানবপাচার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে (Banerjee, 2020)।
এর পাশাপাশি, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়, উদ্বেগ এবং জনসমক্ষে হত্যার ঘটনাও বাড়ছে, যা ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতার ফল।
কক্সবাজারে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে, কারণ তারা নিজেদেরকে সীমান্ত অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গাদের তুলনায় সংখ্যালঘু মনে করছে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
এছাড়া, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাদক সেবন এবং মাদক পাচারকারীর সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে (M. S. Hossain, 2024b)।
সীমান্ত অপরাধ সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা দেয় এবং সীমান্ত এলাকার মানুষের দারিদ্র্য দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
৬.৫ কূটনৈতিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, কারণ উভয় দেশই এক সময়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল।
মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের প্রবেশদ্বার হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান ধারণ করে (Shamsuddin, 2019)।
১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ (তৎকালীন বার্মা ও পূর্ব পাকিস্তান) এর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
১৩ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বার্মা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়।
১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপর্যায়ে সম্পর্ক উন্নত হতে থাকে এবং ১৯৭৪ সালে তা আরও গতি পায়।
তবে ১৯৭৮ সালে বার্মার সেনাবাহিনী পরিচালিত নির্মম নাগামিন অভিযান এর ফলে ৩,০০,০০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে।
এরপর ১৯৯১ সালে আরও ২,৫৬,১৯৩ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসলে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়।
পরবর্তীতে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য জোরদার করতে ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার সফর করেন (Chowdhury, 2023)।
তবে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বহু ঘটনার প্রভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো:
- ২০১২ সালে দীর্ঘদিনের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিয়ে ITLOS-এর রায়,
- ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা গণঅভ্যাগমন,
- ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ)-এর রায়, যেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বাংলাদেশ সীমান্তে মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়,
- এবং ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান।
এই জটিল কূটনৈতিক সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং সহযোগিতা প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করে।
এটি নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত বিরোধ সমাধান, শরণার্থী সংকট ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মতো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রভাবিত করে।
তদুপরি, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বারবার সংঘর্ষের ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী সংস্থার সদস্যরা প্রায়ই ১৯৭৯ সালের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে থাকে, যেখানে বাংলাদেশ বরাবরই শান্তিপূর্ণ সীমান্ত এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার পক্ষে (Sultana, 2019)।
৬.৬ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংস্থার অবকাঠামোগত ঘাটতি
বাংলাদেশে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর জন্য সীমান্ত পর্যবেক্ষণ কার্যকরভাবে পরিচালনা করা বেশ কঠিন, কারণ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। যেমন: নজরদারি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত সীমান্ত বেড়া এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতির অভাব—এগুলো কার্যকর সীমান্ত তদারকিতে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এই ধরনের ঘাটতির ফলে সীমান্তে নজরদারিতে ঘাটতি থেকে যায়, যা অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রম সহজ করে তোলে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং জনবল ছাড়াই সীমান্তে মানুষ ও পণ্যের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এর ফলে অবৈধ অভিবাসন, মাদক চোরাচালান, মানব পাচার এবং অন্যান্য নিরাপত্তাজনিত হুমকি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বাড়তে থাকে। এছাড়া, এই অবকাঠামোগত দুর্বলতা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত সদস্যদের নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে।
যথাযথ অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা, যেমন বর্ডার আউটপোস্ট (BOP) বা আশ্রয়স্থল না থাকলে, সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি বা কঠোর আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে পারেন।
৬.৭ সীমান্ত এলাকার চরম দারিদ্র্য
বাংলাদেশে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য সীমান্ত অঞ্চলের চরম দারিদ্র্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। চোরাকারবারিরা গরিব মানুষের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাদের সীমান্ত পারাপারে উৎসাহিত করে, এমনকি জীবন ঝুঁকিতেও পাঠায়। এটি সীমান্তে প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত (A. Ahmed, 2015)।
সীমান্ত এলাকার মানুষের দারিদ্র্য ও দুর্বল সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা তাদেরকে চোরাচালান, মাদক পাচার এবং মানব পাচারের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার দিকে ঠেলে দেয়।
এই ধরনের চরম অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে মানুষ অবৈধ আয়ের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়, যার ফলে সীমান্তে অবৈধ চলাচল ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত রক্ষীদের জন্য বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়।
এছাড়াও, সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের দুর্বল সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা প্রায়ই মানবিক সংকটের জন্ম দেয়—যেখানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং মৌলিক সেবার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না।
এইসব মানবিক সংকট মোকাবেলায় সীমান্ত রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে তাদের মূল দায়িত্ব সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে সরিয়ে অতিরিক্ত সম্পদ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। ফলে, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাদের কর্মদক্ষতা কমে যেতে পারে।
৭. সম্ভাব্য করণীয়
একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সরাসরি তার সীমান্ত কার্যকরভাবে পরিচালনার ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সীমান্ত সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে তাকে ভিতরের ও বাইরের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপোষ করতে হতে পারে (Alam, 2023)।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যে চলমান সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে উঠতে কৌশলগত সমাধান প্রয়োজন। এই অংশে কিছু সম্ভাব্য করণীয় বা সমাধানমূলক প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বেশিরভাগ চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের সঙ্গে জড়িত।
এই বিশাল সংখ্যক শরণার্থী বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
এই কূটনৈতিক আলোচনা দ্বিপাক্ষিক (বাংলাদেশ-মিয়ানমার) এবং আন্তর্জাতিক—উভয় পর্যায়েই হতে হবে এবং এতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করা উচিত। বাংলাদেশকে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্য ইইউ (EU), ওআইসি (OIC), এবং আসিয়ান (ASEAN) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমর্থন আদায়ে কাজ করতে হবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়া দরকার, যাতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়।
BGB (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং BGP (বর্ডার গার্ড পুলিশ, মিয়ানমার) যৌথভাবে জিরো লাইনে টহল কার্যক্রম চালাতে পারে এবং পাচার ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আটক করতে তথ্য বিনিময় করতে পারে।
চোরাচালান ও সীমান্ত অপরাধের মতো সাধারণ সমস্যাগুলো মোকাবেলায় উভয় পক্ষের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এমনকি কৌশলগত পর্যায়েও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সীমান্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি যোগাযোগ চ্যানেল গড়ে তুলতে সহায়তা করবে, যা সীমান্ত সংঘাত কমাতে এবং কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ, কিন্তু মিয়ানমারে তা নিষিদ্ধ নয়। মিয়ানমারের মাদক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের কিছু চোরাকারবারির সহায়তায় মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। তাই, উভয় দেশকে মাদক পাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মিয়ানমার সরকারের উচিত সীমান্তবর্তী মাদক কারখানা বন্ধ করা বা তা প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনে রূপান্তর করা।
সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা নিয়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় তাদের সম্পৃক্ত করা উচিত।
বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের উচিত সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা, যাতে তাদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাদেরকে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সুযোগের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করতে হবে।
সীমান্ত এলাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন করতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় এবং মানুষের জীবনমান বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং সীমান্তে অবৈধ কার্যকলাপ কমে যাবে।
৮. উপসংহার
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ, যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক দিকসমূহ। এই চ্যালেঞ্জগুলো অত্যন্ত জটিল এবং অনেকগুলো বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেমন: অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, মাদক চোরাচালান, রোহিঙ্গা শরণার্থী আগমন, সীমান্ত অপরাধ, কূটনৈতিক সম্পর্ক, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংস্থার অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সীমান্ত এলাকার চরম দারিদ্র্য।
এই সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে, যা পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়িয়েছে এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান অত্যন্ত জরুরি।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের কৌশলগত ও সমন্বিত উদ্যোগ, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশকে অবশ্যই তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, নতুন ও উদ্ভাবনী কূটনৈতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সহায়তা চেয়ে যেতে হবে।
এছাড়াও, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা উন্নত করতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, উন্নত অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা দীর্ঘমেয়াদে সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে এবং সীমান্ত অপরাধ কমাতে পারবে।
এর জন্য সীমান্ত এলাকার মানুষের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে তাদের জীবনমান উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।
এই গবেষণা কেবল দ্বিতীয়িক তথ্যের (secondary data) উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায়, ভবিষ্যতে প্রাথমিক তথ্য (primary data) ও বাস্তব গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করে আরও গভীর বিশ্লেষণ সম্ভব।
বিশেষ করে, সীমান্ত অপরাধ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং সীমান্ত অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে মাঠ পর্যায়ের গবেষণা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ব্যবহারযোগ্য সুপারিশ দিতে পারে।
লেখকদের অবদান:
মো. মাহবুব-উল-আলম এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ধারণাগত কাঠামোর উপর বিশেষভাবে কাজ করেছেন। তিনি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত দ্বিতীয়িক উৎসের বিশদ পর্যালোচনা করেছেন এবং সেখান থেকে মূল তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গবেষণার প্রধান যুক্তি ও সুপারিশগুলো গঠনে ভূমিকা রেখেছেন।
হেলাল উদ্দিন এই গবেষণায় সহায়তা করেছেন দ্বিতীয়িক তথ্য সংগঠিত ও বিশ্লেষণ করে এবং সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমে কীভাবে কমিউনিটিতে একতা ও সহনশীলতা সৃষ্টি হয়, তা ব্যাখ্যা করে সামগ্রিক বিশ্লেষণে অবদান রেখেছেন।
তারা দুজন মিলে গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশগুলো পরিমার্জনা করেছেন, যাতে এটি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
গবেষকদের পরিচিতি:
মো. মাহবুব-উল-আলম
মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল-আলম বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মরত কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP), ঢাকা-এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অতীতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) খণ্ডকালীন সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি BUP থেকে এমফিল (MPhil) এবং পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
তার গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্রগুলো হলো: সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও কৌশলগত শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন ও সহ-লেখক হিসেবে কাজ করেছেন। তার লেখা “Dynamics of Bangladesh-India Land Border Management” (2023) বইটি সমসাময়িক গবেষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাড়া জাগিয়েছে।
হেলাল উদ্দিন
হেলাল উদ্দিন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP), ঢাকা-এর সেন্টার ফর হায়ার স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ-এর একজন এমফিল (MPhil) ফেলো। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি, তিনি গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট, এক্সেস টু ইনফরমেশন (A2I) প্রোগ্রাম এবং BUP-তে বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে কাজ করেছেন।
তার অভিজ্ঞতা রয়েছে: স্থানীয় শাসনব্যবস্থা, সরকারি সেবা উদ্ভাবন, উচ্চশিক্ষা প্রশাসন এবং নিরাপত্তা নীতিতে। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন ও সহ-লেখক হিসেবে কাজ করেছেন। তার প্রথম বই “Understanding Fundamentals of Public Administration” ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
REFERENCES
Ahamed, A., Chowdhury, M. A., & Rahman, S. (2020). Bangladesh-Myanmar Border Relations: A Study of Some Geopolitical and Economic Issues. European Scientific Journal, 16(22), 320. https://doi.org/10.19044/esj.2020.v16n22p320
Ahmed, A. (2015, July 28). A big challenge in border management is extreme poverty in border areas. The Daily Star.
Ahmed, G. A. (n.d.). Transnational Threats: Challenges for Border Management of Bangladesh. p-126.
Ahmed, N. (2020). Border Haats on Bangladesh-Myanmar Border: Opportunities and Challenges. India-Bangladesh Border
Haats Briefing Paper. https://cuts-crc.org/pdf/briefing-papers-border-haats-on-bangladesh-myanmar-borderopportunities-and-challenges.pdf
Alam, M. M. (2018). Challenges of border management and its impact on national security: Bangladesh perspective. Journal of
Sociology, 1(3), 71-92.
Alam, M. M. (2023). Dynamics of Bangladesh-India Land Border Management. A H Development Publishing House.
Babu, K.E.K. (2020). The impacts and challenges to host country Bangladesh due to sheltering the Rohingya refugees. Cogent
Social Sciences, 6(1), 1-16. https://doi.org/10.1080/23311886.2020.1770943
Banerjee, S. (2020). The Rohingya Crisis and its Impact on Bangladesh-Myanmar Relations, Observer Research Foundation.
Brief no-396. https://www.orfonline.org/public/uploads/posts/pdf/20230510232019.pdf
Banglapedia (2021). Bangladesh Geography. Asiatic Society.
https://en.banglapedia.org/index.php?title=Bangladesh_Geography
BGB. (2023). History of Border Guard Bangladesh. Border Guard Bangladesh. https://bgb.gov.bd/site/page/aa6b0469-8ce0-
4678-a348-87a582a096fe/-
Chowdhury, B. G. S. M. (2017). Bangladesh Myanmar Relation: A Study on Prospects of Connectivity & Economic Development
and Scope of Security Cooperation. National Defense College, Bangladesh.
Chowdhury, M. G. Md. N. A. (2023). Bangladesh Myanmar Relations Amidst Rohingya Crisis: An Evaluation Through Regional
Security Complex Theory. Al-Hamra Prakashani.
Daily Jugantor. (2019, February 19). উখিয়া সীমান্তে কড়াকখড়, তবু থেন্তম থেই থচারাচালাে [The Ukhia border is tight, but smuggling has not
stopped]. Daily Jugantor. https://www.jugantor.com/todays-paper/news/146181/%E0%A6%89%E0%A
Dewan, N. A. (2017, February 10). Drug trafficking over Bangladesh-Myanmar border. The Financial Express.
https://thefinancialexpress.com.bd/views/letters/drug-trafficking-over-bangladesh-myanmar-border
Ehsan, B. G. A. B. M. N. (2023). Challenges of Border Management and Its Impact on National Security of Bangladesh
[Unpublished dissertation for NDC Course]. National Defense College, Bangladesh.
Guhathakurta, M. (2017, September 23). Complicated History of Myanmar-Bangladesh Border. The Daily Sun.
https://www.daily-sun.com/printversion/details/256728/Complicated-History-of-MyanmarBangladesh-BorderGutberlet, S. (2020). Arms Trafficking Through Cox’s Bazar, Bangladesh. Stable Seas. https://www.stableseas.org/post/armstrafficking-through-cox-s-bazar-bangladesh
Halim, B. Md. A. (2021). Laws on Border Guard Bangladesh. The CCB Book Center.
Hoque, M. M. M., Rehnuma, M., Uddin, S., Sabbir, A., Sarker, M. E., & Biswas, G. K. (2021). Impacts of Rohingya Migration
on Surrounding Environment of Ukhiya, Bangladesh. American Journal of Pure and Applied Biosciences, 106–112.
https://doi.org/10.34104/ajpab.021.01060112
Hossain, D. (2023, January 2). Geopolitics, Bangladesh-Myanmar Border and External Forces in Myanmar. Press Xpress.
Hossain, M. S. (2024a, February 8). Myanmar poses new geopolitical challenge for Bangladesh. Daily Prothom-Alo.
https://en.prothomalo.com/opinion/op-ed/te84krw2rx
Hossain, M. S. (2024b, March 4). Bangladesh bears the brunt of Rohingya crisis. Daily Observer.
https://www.observerbd.com/news.php?id=462654
Kader, M. F., & Choudhury, A. H. (2019). Historical Background of the Rohingya Refugee Crisis and the Implication of Their
Statelessness. International Journal of Social Sciences and Economic Review, 1(1), 8–15.
https://doi.org/10.36923/ijsser.v1i1.23
Khan, H. M. (2016). Threat Perceptions in the Myanmar–Bangladesh Borderlands. In N. Cheesman & N. Farrelly (Eds.), Conflict
in Myanmar: War, Politics, Religion. ISEAS Yusuf Ishak Institute.
Khan, M. J. (2021, November 17). Firearms Smuggling: Syndicate eyeing polls, Rohingya camps. The Daily Star.
Khan, M., Mantel, S., & Chowdhury, E. (2007). State of the Environment of the Chittagong Hill Tracts.
Khan, N.-U.-Z. (2022). Rohingya Crisis: Security Implications on Bangladesh and Ways Ahead [Unpublished master’s thesis,
U.S. Army Command and General Staff College]. https://apps.dtic.mil/sti/trecms/pdf/AD1210408.pdf
Khanam, S. S., & Ali, Md. M. (2022). Foreign Policies towards Rohingya Refugees: A Comparative Study of Bangladesh and
Myanmar. Asian Journal of Social Sciences and Legal Studies, 4(5), 178–188.
https://doi.org/10.34104/ajssls.022.01780188
Maizland, L. (2022). Myanmar’s Troubled History: Coups, Military Rule, and Ethnic Conflict. Council on Foreign Relations.
https://www.cfr.org/backgrounder/myanmar-history-coup-military-rule-ethnic-conflict-rohingya
Manurung, H. (2021). Myanmar Political Instability: A Threat to Southeast Asia Stability. Journal of Asia Pacific Studies, 5(1),
22-35. https://doi.org/10.33541/japs.v5i1.2671
MoFA. (n.d.). Bangladesh Myanmar Bilateral Relations, Ministry of Foreign Affairs. Ministry of Foreign Affairs, Embassy of
the People’s Republic of Bangladesh, Yangon, Myanmar. Retrieved July 12, 2024, from
https://yangon.mofa.gov.bd/en/site/page/Bilateral-Relations
Mollick, M. M. U. (2023). Revisiting Rohingya Crisis- Weighing out Options for Bangladesh [Unpublished dissertation for NDC
Course]. National Defense College, Bangladesh.
Munir, S. (2020). Geopolitics of Rakhine Region: A Bangladesh Perspective. Torkel Opsahl Academic E-Publisher Policy Brief
Series No. 119. https://www.toaep.org/pbs-pdf/119-munir/
Nesa, M. (2022). Bridging Two Asias: Bangladesh’s Diplomacy of Regional Cooperation and Bilateral Engagements. Journal
of Bangladesh and Global Affairs, 1(1), 143-164.
Palma, P., & Molla, M. A.-M. (2024, January 19). Wait for Rohingya repatriation gets even longer. The Daily Star.
Parnini, S. N. (2013). The Crisis of the Rohingya as a Muslim Minority in Myanmar and Bilateral Relations with Bangladesh.
Journal of Muslim Minority Affairs, 33(2), 281–297. https://doi.org/10.1080/13602004.2013.826453
Rahman, M. M. (2023). Rohingya Crisis, Transboundary and Geopolitics: Prospects and Aspects of Bangladesh. International
Journal of Social Science and Human Research, 6(01), 197-201. https://doi.org/10.47191/ijsshr/v6-i1-27
Rahman, Md. H. (2024, February 6). Crisis at the Bangladesh-Myanmar Border: A Looming Regional Challenge. The Diplomat.
https://thediplomat.com/2024/02/crisis-at-the-bangladesh-myanmar-border-a-looming-regional-challenge
Rashid, Ahamed, A., & Rahman, Md. S. (2020). A Critical Study on the Transnational Organized Crime along the BangladeshMyanmar Border. International Journal of Sciences: Basic and Applied Research, 52(5), 203–2016.
Rashid, M. (2024, January 19). Bangladesh Moves to Boost Security on Myanmar Border. The Irrawaddy.
https://www.irrawaddy.com/news/burma/bangladesh-moves-to-boost-security-on-myanmar-border.html
Shamsuddin, B. G. H. M. (2019). Strengthening Bangladesh – Myanmar Relations: A Focus on Economic Issues and
Connectivity. NDC E-Journal, 18(1), 43–46. https://ndcjournal.ndc.gov.bd/ndcj/index.php/ndcj/article/view/251
Sheikh, Y. A. (1998). Bangladesh-Myanmar Relations: Making the Best of Proximity. BIISS Journal, 19(4), 471–501.
Shikha, D. (2014, June 20). Bangladesh-Myanmar Border Skirmishes: Who, What and Why. Institute of Peace and Conflict
Studies. https://www.ipcs.org/comm_select.php?articleNo=4524
Sultana, A. (2019). Bangladesh-Myanmar Relations: Challenges and Prospects. Asia Studies. Jahangirnagar University Journal
of Government and Politics, 38, 49–60.
Tayeb, T. (2024, February 6). Civil war in Myanmar: Bangladesh should beef up border security. The Daily Star.
The Business Standard. (2022, July 20). Myanmar army directly involved in trafficking Yaba to Bangladesh: Prof Imtiaz. TBS
Report. https://www.tbsnews.net/bangladesh/myanmar-army-directly-involved-trafficking-yaba-bangladesh-profimtiaz-461982
Yasmin, K. (2017). Rohingya Crisis in the Light of International Refugee Convention 1951: A Study on Security Perspective of
Bangladesh. Journal of Alternative Perspectives in the Social Sciences, 8(4), 401–423.
Zaman, R. (2017, September 1). Can Bangladesh turn its burdensome geography into a blessing? East Asia Forum.
https://eastasiaforum.org/2017/09/01/can-bangladesh-turn-its-burdensome-geography-into-a-blessing


Leave a Reply