চীন এবং ভারতের স্বনির্মিত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ

চীন এবং ভারতের স্বনির্মিত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ

সারসংক্ষেপ
এই প্রবন্ধে চীন এবং ভারতের স্বনির্মিত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির অগ্রগতির তুলনা করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, বিমান, নৌবাহিনী, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং উদীয়মান প্রযুক্তি সম্পর্কিত প্রধান ক্ষেত্রগুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এতে চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ভারতের তুলনায় অনেক বেশি উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ভারতের স্বনির্ভরতার প্রতি প্রচেষ্টাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই তুলনা উভয় দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত বিষয়গুলো তুলে ধরেছে।

১. পরিচিতি
চীন এবং ভারত, পৃথিবীর দুই বৃহত্তম এবং জনবহুল দেশ, এশিয়ার কৌশলগত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উভয় দেশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে, তবে তাদের অগ্রগতি ভিন্ন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণ দ্বারা প্রভাবিত। চীন যেখানে অনেক প্রতিরক্ষা খাতে বৈশ্বিক নেতা হিসাবে বিবেচিত, সেখানে ভারত “আত্মনির্ভর ভারত” উদ্যোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। এই প্রবন্ধে এ বিষয়গুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

২. প্রতিরক্ষা বাজেট ও বিনিয়োগ
চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০২৩ সালে প্রায় ২৩,০০০ কোটি ডলার, যা ভারতের ৮,০০০ কোটি ডলারের বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি। এই বড় আর্থিক ব্যবধান চীনকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যেমন হাইপারসনিক অস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর মতো ক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ করার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে, ভারতের সীমিত বাজেট এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা এর অগ্রগতিকে সীমাবদ্ধ করেছে। তবে, ভারতের স্বনির্ভরতা প্রচেষ্টা ইতিমধ্যে ফল দিতে শুরু করেছে। [১]

৩. ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি
চীনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম উন্নত। চীনের DF-41 নামক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) ১২,০০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম এবং এটি একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। [২] ভারতের ক্ষেত্রে, অগ্নি সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র, বিশেষ করে অগ্নি-V, এবং ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে ভারতের হাইপারসনিক প্রোগ্রাম এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। [৩]

৪. বিমান এবং এভিয়েশন প্রযুক্তি
চীনের চেংদু J-20 স্টিলথ ফাইটার বিমান এবং শেনইয়াং FC-31 তাদের উন্নত সামরিক এভিয়েশন প্রযুক্তি প্রদর্শন করে। [৪] অন্যদিকে, ভারতের তৈরি তেজস হালকা যুদ্ধ বিমান (LCA) একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলেও এটি চীনের পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ভারত রুস্তমের মতো UAV (ড্রোন) উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে তার ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। [৫]

৫. নৌবাহিনী ক্ষমতা
চীনের দুটি বিমানবাহী রণতরী, লিয়াওনিং এবং শ্যানডং, এবং টাইপ ০০৩-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির রণতরী চীনের নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করেছে। [৬] ভারতের INS বিক্রান্ত এবং অরিহন্ত শ্রেণির সাবমেরিন উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলেও, প্রযুক্তিগত ও স্কেলের দিক থেকে চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। [৭]

৬. মহাকাশ প্রযুক্তি
চীনের মহাকাশ কার্যক্রমে তিয়ানগং স্পেস স্টেশন, মঙ্গল অভিযান তিয়ানওয়েন-১, এবং উন্নত উপগ্রহ-বিধ্বংসী (ASAT) ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত। [৮] ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) চন্দ্রযান এবং মঙ্গলযানের মতো উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করেছে। মিশন শক্তি (২০১৯)-এর মাধ্যমে ভারতের সামরিক মহাকাশ সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। [৯]

৭. উদীয়মান প্রযুক্তি
চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সাইবার যুদ্ধের মতো প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে। [১০] অন্যদিকে, ভারত এসব ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকার সমর্থিত বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে উন্নতির চেষ্টা করছে। [১১]

৮. চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ
চীনের শক্তি এর বিশাল বাজেট এবং সামরিক-শিল্প ক্ষেত্রের একীভূতকরণে রয়েছে। তবে এর চ্যালেঞ্জ হল উদ্ভাবন ধরে রাখা এবং রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো। ভারতের চ্যালেঞ্জগুলো হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা। [১২] তবে “মেক ইন ইন্ডিয়া” উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা নির্মাতাদের সাথে সহযোগিতা ভারতের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। [১৩]

উপসংহার
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে চীন ভারতের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকলেও, ভারতের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাকে একটি স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। গবেষণা ও উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত এই ব্যবধান কমাতে পারে।


তথ্যসূত্র
১. SIPRI Military Expenditure Database, 2023
২. Chinese Academy of Sciences, “Advancements in Hypersonic Technology,” 2022
৩. DRDO, “Agni Series Missiles,” 2023
৪. Jane\u2019s Defense Weekly, “China\u2019s J-20 and FC-31 Fighters,” 2022
৫. Indian Ministry of Defense, “Tejas LCA Program,” 2023
৬. Jane\u2019s Defense Weekly, “China\u2019s Naval Modernization,” 2022
৭. Indian Ministry of Defense, “INS Vikrant and Arihant-Class Submarines,” 2023
৮. Chinese Space Agency, “Tiangong Space Station Program,” 2022
৯. ISRO Annual Report, 2023
১০. National Defense Strategy of China, “AI and Emerging Technologies,” 2022
১১. Indian Ministry of Defense, “AI and Cybersecurity Initiatives,” 2023
১২. Reuters, “India\u2019s Mission Shakti ASAT Test,” 2019


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *