২০২৫ সালের সবচেয়ে স্মরণীয় একটি দৃশ্য ছিল—কোটিপতি ইলন মাস্ক (Elon Musk), যিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) সরকারের একজন বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন। তাকে দেখা গিয়েছিল একটি চকচকে লাল রঙের চেইনসো (chainsaw—বড় আকারের বৈদ্যুতিক করাত) হাতে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের খরচ কমানোর কথা বলতে। এটি ছিল আসন্ন কঠোর সিদ্ধান্তগুলোর একটি রূপক। পরে সত্যিই একের পর এক মহাকাশ মিশন বাতিল হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি বাতিল করা হয়। এর ফলে বিজ্ঞান খাত বড় আঘাতের মুখে পড়ে।
সবকিছুর শুরু হয়েছিল হঠাৎ করেই। জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর ট্রাম্প একটি নির্দেশে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সংস্থাগুলো থেকে দেওয়া অনুদান (grant) ও ঋণ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে হাজার হাজার গবেষণা অনুদান বাধাগ্রস্ত হয় বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এসব অনুদানের বড় একটি অংশ তদারকি করত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (National Institutes of Health—NIH), যা বিশ্বের অন্যতম বড় চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞান গবেষণা তহবিলদাতা সংস্থা, এবং ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন (National Science Foundation—NSF)।
গ্রান্ট উইটনেস (Grant Witness)—একটি ওয়েবসাইট যা ট্রাম্পের সময় ফেডারেল গবেষণা অনুদানের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে—এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু NIH এবং NSF থেকে অনুদান কমানো হয়েছে মোট প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।

চিত্র ২.১ : ইলন মাস্ক (Elon Musk) ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান নীতি নিয়ে বিতর্ক
পরবর্তী কয়েক মাসে ইলন মাস্ক একটি স্বাধীন টাস্কফোর্সের নেতৃত্ব দেন, যার নাম ছিল ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (Department of Government Efficiency—DOGE)। এর লক্ষ্য ছিল সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানো। DOGE-এর সিদ্ধান্তগুলো পুরো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ওপর প্রভাব ফেললেও, এর অনেক প্রভাব সরাসরি বিজ্ঞানীদের ওপর পড়ে।
এমনকি অক্টোবরে এসে ট্রাম্প প্রশাসন জানায় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (US Geological Survey)—যা দেশটির কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে—এর বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে চায়। একই সঙ্গে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসেও কাটছাঁটের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। এই সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের সংরক্ষিত বন ও জমির দেখভাল করে, যা প্রাণীদের আশ্রয়স্থল এবং জীববিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের জন্য একটি জীবন্ত গবেষণাগার হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় বিনিয়োগ করেছে অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ হিসেবে। এই ধারণাটি প্রথম তুলে ধরা হয় ১৯৪০–এর দশকে অফিস অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (Office of Scientific Research and Development)—এর প্রধানের মাধ্যমে। এই সংস্থাটিই পরে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের (National Science Foundation—NSF) আগের রূপ ছিল।
এই চিন্তাধারার নাম দেওয়া হয়েছিল “এন্ডলেস ফ্রন্টিয়ার” (endless frontier—অর্থাৎ সীমাহীন অগ্রগতির পথ)। এটি ছিল একটি নতুন ও সাহসী ধারণা, যার লক্ষ্য ছিল গবেষণা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়া। এই প্রযুক্তিগুলো পরে পুরো পৃথিবীকে বদলে দেয়। কিন্তু ট্রাম্প এই ব্যবস্থাটিকে কার্যত ভেঙে দিয়েছেন।
“এর ফলে সম্ভবত আরও বেশি বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাবেন, আর পৃথিবীর সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলোর জন্য অর্থায়ন কমে যাবে।”
তিনি শুধু ফেডারেল সরকারের গবেষণা কাঠামোর বড় একটি অংশ ভেঙে দেননি, তার প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে যেন তারা তাদের শিক্ষা ও গবেষণাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। বিজ্ঞানকে অস্বীকার করার ক্ষেত্রে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে যান।
এতে কারও তেমন অবাক হওয়ার কিছু ছিল না যে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ট্রাম্প বিশ্বে জলবায়ু সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি—প্যারিস চুক্তি (Paris Agreement)—থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন। একই বছরের পরে, জাতিসংঘে (United Nations) ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকে “পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা” বলে উল্লেখ করেন।
শুধু কথাতেই থেমে থাকেনি ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার আগে যেসব গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু তথ্যভান্ডার ও প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, সেগুলোর অনেকগুলো বাতিল করা হয় বা দুর্বল করে দেওয়া হয়। বিজ্ঞান–সম্পর্কিত অনেক সংস্থায় কর্মী সংখ্যা কমে যাওয়ায়, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (National Oceanic and Atmospheric Administration—NOAA)–এর মাসিক জলবায়ু প্রতিবেদন বিষয়ক আলোচনা সভাগুলো বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্লাইমেট অ্যাসেসমেন্ট (US National Climate Assessment)—এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
যেসব কর্মী তখনও কাজ করছিলেন, তারাও প্রশাসনের অবস্থান মেনে চলতে বাধ্য হন। যেমন, চলতি বছরের শুরুতে NOAA–এর বিজ্ঞানীরা উষ্ণ আবহাওয়ার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে স্বাধীন জলবায়ু গবেষকরা বিস্মিত হয়ে পড়েন।
১০,০০০
স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগে (Department of Health and Human Services) চাকরি হারানোর সংখ্য
৪৭%
নাসার (NASA) বিজ্ঞান বাজেটে প্রস্তাবিত কাটছাঁটের হার
তথ্যসূত্র:
Chelsea Whyte,
A year when US science was on the chopping block,
New Scientist, Volume 268, Issues 3573–3574,
2025, Pages 20-21, ISSN 0262-4079,
https://doi.org/10.1016/S0262-4079(25)02019-6.
(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407925020196)
Abstract: The Trump administration has targeted everything from public health to space missions, reports Chelsea Whyte


Leave a Reply