ওজেম্পিকের (Ozempic) মতো ওষুধগুলো আসক্তির চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে এবং এমনকি বার্ধক্য ধীর করতেও ভূমিকা রাখতে পারে—এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
নোট (টার্ম ব্যাখ্যা): GLP-1s (Glucagon-Like Peptide-1s) — শরীরের একটি হরমোন–সংক্রান্ত ব্যবস্থার ওপর কাজ করা ওষুধের একটি শ্রেণি, যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
আগে মউনজারো (Mounjaro), ওয়েগোভি (Wegovy) ও ওজেম্পিক (Ozempic)–এর মতো ওষুধগুলোকে ধনী ও বিখ্যাত মানুষদের ওজন কমানোর উপায় হিসেবে প্রশংসা করা হতো, আবার কেউ কেউ এগুলো নিয়ে সমালোচনাও করত। কিন্তু ২০২৫ সালে এসব ওষুধের ভূমিকা অনেক বেশি বিস্তৃত হয়ে ওঠে। এগুলো আর শুধু স্থূলতা (obesity) ও টাইপ–২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রে ওজেম্পিক কিডনি রোগ এবং হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির রোগের চিকিৎসার জন্যও অনুমোদন পায়। তবে বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। এই ওষুধগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে—এমন প্রমাণ এ বছর ব্যাপকভাবে সামনে আসে।
এর আগেই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে এসব ওষুধ ডায়াবেটিস ও স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের বাইরেও আরও অনেক কাজে আসতে পারে। এই ওষুধগুলো শরীরের অন্ত্রে থাকা একটি হরমোনের মতো কাজ করে, যার নাম গ্লুকাগন–লাইক পেপটাইড–১ (glucagon-like peptide-1—GLP-1)। ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা যায়, এগুলো হৃদ্আঘাত ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে পারে, বিষণ্নতা ও উদ্বেগ হ্রাস করতে সাহায্য করে এবং এমনকি স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির অবনতি ধীর করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
শুরুর দিকে অনেকেই মনে করেছিলেন, এসব উপকারিতা শুধু ওজন কমার একটি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। কারণ স্থূলতা (obesity) অনেক রোগের ক্ষেত্রেই একটি বড় ঝুঁকির কারণ। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতেই পরিষ্কার হয়ে যায়, এখানে অন্য কিছু ঘটছে।
আরও বিস্তারিত গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ যতটা ওজন কমাচ্ছিল তার ওপর নির্ভর না করেও তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছিল। গবেষকরা তখন বুঝতে শুরু করেন, GLP-1 ওষুধগুলো শরীরের একাধিক জৈবিক পথে কাজ করে। এর মধ্যে কিছু পথ প্রদাহের (inflammation—শরীরের ভেতরের ফোলা বা প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া) সঙ্গে জড়িত।

চিত্র ২.৩ : GLP-1 ওষুধের কার্যপ্রক্রিয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা
এই ওষুধগুলো দেহের বিপাক প্রক্রিয়া (metabolism—শরীর যেভাবে খাবারকে শক্তিতে রূপান্তর করে) এবং মস্তিষ্কের এমন কিছু স্নায়ুপথেও প্রভাব ফেলে, যেগুলো প্রেরণা, পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি ও মনের অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণেই হয়তো মদ্যপানের আসক্তি (alcohol dependency) এবং বিষণ্নতা (depression) কমানোর ক্ষেত্রেও এগুলোর নতুন উপকারিতা দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি পর্যন্ত এসব প্রমাণের বড় একটি অংশ এসেছিল প্রাণীর ওপর করা পরীক্ষা অথবা পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা থেকে। কিন্তু ২০২৫ সালে বড় আকারের একাধিক র্যান্ডমাইজড গবেষণা (randomised trials—যেখানে অংশগ্রহণকারীদের এলোমেলোভাবে ভাগ করে পরীক্ষা করা হয়) শুরু হয়, যেগুলো এসব ওষুধের আরও বিস্তৃত প্রভাব খতিয়ে দেখে।
জানুয়ারি মাসে গবেষকরা জানান, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত যারা নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি GLP-1 ওষুধ গ্রহণ করছিলেন, তাদের ৪২টি রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এর মধ্যে ডিমেনশিয়া (dementia—স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি ধীরে ধীরে কমে যাওয়া) এবং পেশির ব্যথার মতো সমস্যাও ছিল। অন্যদিকে, যারা শুধু প্রচলিত চিকিৎসাই নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
তবে সব খবরই ভালো ছিল না। এসব ওষুধের সঙ্গে আরও ১৯টি সমস্যার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কিডনিতে পাথর হওয়ার বিষয়টি রয়েছে। তবু সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, এসব ওষুধের উপকারিতা ক্ষতির তুলনায় বেশি।
গত এক বছরে পাওয়া সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো কিছু আবিষ্কার হয়েছে মস্তিষ্ক নিয়ে। GLP-1 ওষুধ এবং আসক্ত আচরণ কমে যাওয়ার মধ্যে যে সম্পর্ক থাকার সন্দেহ ছিল, তা প্রথমবারের মতো সরাসরি পরীক্ষা করা একটি র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (randomised clinical trial—এলোমেলোভাবে অংশগ্রহণকারী বাছাই করে করা চিকিৎসা পরীক্ষা) থেকে সমর্থন পেয়েছে।
নয় সপ্তাহের একটি গবেষণায় মদ্যপানের আসক্তিতে ভোগা ৪৮ জন মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে যারা সেমাগ্লুটাইড (semaglutide—ওজেম্পিক ও ওয়েগোভিতে ব্যবহৃত ওষুধ) পেয়েছিলেন, তারা কম মদ্যপান করেছেন এবং মদ খাওয়ার তীব্র ইচ্ছাও কম অনুভব করেছেন। অন্যদিকে, যারা প্লাসিবো (placebo—কার্যকর ওষুধ নয়, কিন্তু ওষুধের মতো দেখায়) পেয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এমন ফল দেখা যায়নি।
“এ পর্যন্ত যে অগ্রগতি হচ্ছে, তা নিয়ে আমরা খুবই উৎসাহিত,” বলেন টনি গোল্ডস্টোন (Tony Goldstone), ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন (Imperial College London)–এর একজন গবেষক। তিনি বলেন, “আসক্তির চিকিৎসার জন্য আমাদের হাতে খুব বেশি ওষুধ নেই। কিন্তু GLP-1 ওষুধগুলো আগে থেকেই অন্য রোগের জন্য অনুমোদিত, তাই আমরা জানি এগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।”
এ বছর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানসিক বা চিন্তাশক্তি–সংক্রান্ত উপকারিতাও সামনে আসে। এপ্রিল মাসে ২৬টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের (clinical trials—মানুষের ওপর করা চিকিৎসা পরীক্ষা) একটি মেটা–অ্যানালাইসিস (meta-analysis—একাধিক গবেষণার ফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা) প্রকাশিত হয়। এতে ১ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। গবেষণায় দেখা যায়, GLP-1 ওষুধগুলো সব ধরনের ডিমেনশিয়ার (dementia—স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি ধীরে ধীরে কমে যাওয়া) ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
এর আগে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন (Imperial College London)–এর গবেষক পল এডিসন (Paul Edison)–এর নেতৃত্বে করা একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এক বছর ধরে GLP-1 ওষুধ লিরাগ্লুটাইড (liraglutide—স্যাক্সেন্ডা ও নেভোলাট নামে পরিচিত ওষুধে ব্যবহৃত উপাদান) দিয়ে চিকিৎসা করলে মস্তিষ্কের সংকোচন প্রায় অর্ধেক কমে যায়। একই সঙ্গে প্লাসিবো (placebo—কার্যকর ওষুধ নয়, কিন্তু ওষুধের মতো দেখায়) ব্যবহারকারীদের তুলনায় তাদের চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার হার ১৮ শতাংশ ধীর হয়ে যায়।
এডিসন (Edison) মনে করেন, আলঝেইমার রোগ (Alzheimer’s disease) কোনো একক কারণে হয় না। বরং একাধিক রোগজনিত প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করার ফলেই এই রোগ তৈরি হয়। তার মতে, GLP-1 ওষুধগুলো এই প্রক্রিয়াগুলোর কয়েকটির ওপর একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এগুলো কিনেজ পথের (kinase pathways—কোষের ভেতরে সংকেত আদান–প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা) মাধ্যমে স্নায়ুকোষ বা নিউরনকে সুরক্ষা দেয়, যা কোষের চাপ মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা (insulin sensitivity—শরীর কত ভালোভাবে ইনসুলিনের সাড়া দেয়) বাড়িয়ে কোষের ক্ষতি কমায় এবং প্রদাহও হ্রাস করে।
তবে ভালো খবর এখানেই শেষ হয়নি। এপ্রিলের শেষ দিকে GLP-1 ওষুধগুলো প্রথমবারের মতো এমন একটি ওষুধ হিসেবে প্রমাণ দেয়, যা নন–অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের (non-alcoholic fatty liver disease—মদ্যপান ছাড়াই যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমার রোগ) একটি গুরুতর রূপে স্পষ্ট উপকার করে। এই রোগে যকৃতে চর্বি জমে প্রদাহ ও ক্ষত তৈরি হয়, যা পরে সিরোসিস (cirrhosis—যকৃত শক্ত হয়ে যাওয়া) এবং ক্যানসারের দিকেও নিয়ে যেতে পারে।
এমনকি বার্ধক্য নিয়েও নতুন তথ্য সামনে আসে। এইচআইভি–সংক্রান্ত একটি জটিলতায় ভোগা কিছু মানুষের ওপর করা একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, এই জটিলতা বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে দ্রুত করে। ওই গবেষণায় যারা ৩২ সপ্তাহ ধরে ওজেম্পিক (Ozempic) ইনজেকশন পেয়েছিলেন, গবেষণার শেষে তারা গড়ে জৈবিকভাবে ৩.১ বছর কম বয়সী ছিলেন। অন্যদিকে, যারা প্লাসিবো (placebo—কার্যকর ওষুধ নয়, কিন্তু ওষুধের মতো দেখায়) পেয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
এই গবেষণায় কাজ করা ভারুণ দ্বারাকা (Varun Dwaraka) বলেন, তিনি কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের লেক্সিংটনে (Lexington, Kentucky) অবস্থিত ডায়াগনস্টিকস কোম্পানি ট্রুডায়াগনস্টিক (True Diagnostic)–এ কর্মরত। তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, এসব প্রভাব শুধু ওজন কমার ফল নয়।
এই যুগের শ্রেষ্ঠী যেন একটি সুইস আর্মি নাইফের মতো। (২০২৬) সালে এটি নিঃসন্দেহে আরও নতুন তথ্য সহকারে আসবে, যা আমার মতো পাঠক এর প্রকৃত সীমাবদ্ধতাগুলো জানতে সহায়তা করবে।
আর এই অগ্রগতির গতি কমার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বছরের শেষ দিকে করা গবেষণাগুলোতে GLP-1 ওষুধের সঙ্গে বয়সজনিত ছানি (cataracts), সোরিয়াসিস (psoriasis—চর্মরোগের একটি ধরন) এবং এমনকি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়তা করা গুরুত্বপূর্ণ স্টেম সেলের (stem cells—যে কোষ থেকে নতুন কোষ তৈরি হয়) পুনর্গঠনের উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এই ওষুধের শ্রেণিটিকে অনেকেই সুইস আর্মি নাইফের (Swiss Army Knife—একটি বহুমুখী যন্ত্র) সঙ্গে তুলনা করেন, কারণ এটি একসঙ্গে অনেক কাজে আসতে পারে। ২০২৬ সালে এ বিষয়ে আরও নতুন তথ্য পাওয়া যাবে বলেই মনে করছেন গবেষকরা। তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন—এক ধরনের চিকিৎসা কীভাবে এতগুলো রোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর প্রকৃত সীমাবদ্ধতাগুলো ঠিক কোথায়।
তথ্যসূত্র:
Helen Thomson,
We uncovered the true potential of GLP-1s,
New Scientist,
Volume 268, Issues 3573–3574,
2025,
Page 23,
ISSN 0262-4079,
https://doi.org/10.1016/S0262-4079(25)02021-4.
(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407925020214)
Abstract: Drugs like Ozempic were shown to treat addiction and even slow ageing

Leave a Reply