জিন পরিবর্তন : বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার দাবি বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি সমর্থন করেননি

কলোসাল বায়োসায়েন্সেস (Colossal Biosciences) দাবি করেছিল যে তারা ডায়ার উলফ (dire wolf—এক ধরনের বিলুপ্ত নেকড়ে)–কে আবার ফিরিয়ে এনেছে। তবে জীববিজ্ঞানীরা এই দাবির ওপর ঠান্ডা পানি ঢেলে দেন, অর্থাৎ তারা এই দাবিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি। কলোসাল বায়োসায়েন্সেস (Colossal Biosciences) নিজেকে “বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার কোম্পানি” বলে পরিচয় দেয়। এ বছর প্রতিষ্ঠানটি এই দাবির কারণে অনেক শিরোনামে উঠে আসে। তবে এই প্রচারণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুব কম ছিল।

প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই কোম্পানি আলোচনায় আসে লোমশ ইঁদুর নিয়ে। তারা দাবি করেছিল, এসব ইঁদুরকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে তাদের মধ্যে ম্যামথের (mammoth) মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিন্তু যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Sheffield) ভিক্টোরিয়া হেরিজ (Victoria Herridge) ব্লুস্কাই (Bluesky)–এ জানান, গণমাধ্যমে যেসব ইঁদুরের ছবি ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলোর লম্বা লোম ম্যামথের ডিএনএ ব্যবহার করে জিন পরিবর্তনের ফল নয়। তিনি আরও বলেন, জিনতত্ত্ববিদরা বহু দশক ধরেই লম্বা লোমযুক্ত ইঁদুর তৈরি করে আসছেন। বরং যেসব ইঁদুরে ম্যামথ–সম্পর্কিত 

জিন পরিবর্তন বেশি ছিল, সেগুলো দেখতে ম্যামথের মতো কমই লাগছিল।

চিত্র ২.৪ : পরীক্ষামূলকভাবে জিন সম্পাদিত “woolly mouse”

এরপর আসে সবচেয়ে বড় দাবি। কোম্পানির প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তারা নাকি বিশ্বের প্রথম “ডি–এক্সটিংশন” (de-extinction—বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনা) ঘটিয়েছে। কলোসাল দাবি করে, তারা ডায়ার উলফ (dire wolf—বিলুপ্ত নেকড়ে সদৃশ প্রাণী), যার বৈজ্ঞানিক নাম এেনোসায়ন ডাইরাস (Aenocyon dirus),–কে আবার ফিরিয়ে এনেছে। এই প্রাণীটি প্রায় ১০,০০০ বছর আগে বিলুপ্ত হওয়ার আগে আমেরিকা মহাদেশে বাস করত।

বাস্তবে কলোসাল (Colossal) যা করেছিল, তা হলো ধূসর নেকড়ে (grey wolf—Canis lupus)–এর কোষের জিনোমে ২০টি ছোট পরিবর্তন করা। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি পরিবর্তন ডায়ার উলফের (dire wolf) জিনোমের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। এরপর এই পরিবর্তিত কোষগুলো ক্লোন করে তিনটি নেকড়ে শাবক তৈরি করা হয়।

কিন্তু এই দুই প্রজাতির মধ্যে লক্ষ লক্ষ জিনগত পার্থক্য রয়েছে। তাই এই কাজটি ধূসর নেকড়েকে ডায়ার উলফের মতো বানানোর পথে খুবই ছোট একটি পদক্ষেপ মাত্র। এটি জুরাসিক পার্ক–ধাঁচের (Jurassic Park–style) সেই ধারণা থেকে অনেক, অনেক দূরে, যেখানে বিলুপ্ত প্রাণীর একেবারে হুবহু জিনগত অনুলিপি তৈরি করা হয়।

অধিকাংশ গণমাধ্যম এই “ডি–এক্সটিংশন” (de-extinction—বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনা)–এর দাবিটি কোনো প্রশ্ন ছাড়াই প্রকাশ করে। কিন্তু নিউ সায়েন্টিস্ট (New Scientist) ছিল হাতে গোনা কয়েকটি মাধ্যমের একটি, যারা এই দাবিটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।

কলোসালের প্রধান বিজ্ঞানী বেথ শ্যাপিরো (Beth Shapiro) প্রাণীর বাহ্যিক গঠন বা চেহারার ভিত্তিতে এই ডি–এক্সটিংশন দাবিকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “আমরা রূপগত প্রজাতি ধারণা (morphological species concept—প্রাণীর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে প্রজাতি নির্ধারণের ধারণা) ব্যবহার করছি। অর্থাৎ, যদি কোনো প্রাণী দেখতে অন্য একটি প্রাণীর মতো হয়, তাহলে আমরা তাকে সেই প্রাণীই বলছি।” তিনি ৭ এপ্রিল নিউ সায়েন্টিস্টকে এ কথা জানান।

জিনগত পার্থক্যের বিষয়টি এক পাশে রাখলেও, এই ক্লোন করা ধূসর নেকড়েগুলো আদৌ বিলুপ্ত প্রাণীর মতো দেখতে কি না—তা স্পষ্ট নয়। এপ্রিল মাসে প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর 

কনজারভেশন অব নেচার (International Union for Conservation of Nature—IUCN)–এর ক্যানিড (canids—নেকড়ে ও কুকুরজাতীয় প্রাণী) বিশেষজ্ঞদের একটি দল ঘোষণা করে, “জিন পরিবর্তন করা এই প্রাণীগুলো ধূসর নেকড়ের তুলনায় আলাদা কোনো বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। একই সঙ্গে এগুলো যে ডায়ার উলফের মতো দেখায়, তারও কোনো প্রমাণ নেই।”

নিউ সায়েন্টিস্ট (New Scientist)–কে দেওয়া দ্বিতীয় এক সাক্ষাৎকারে, এমনকি শ্যাপিরো (Shapiro) নিজেও এই বিষয়টি আংশিকভাবে মেনে নেন। তিনি বলেন, “আগে জীবিত ছিল—এমন কোনো প্রজাতিকে হুবহু একইভাবে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমাদের প্রাণীগুলো আসলে ধূসর নেকড়ে, যাদের জিনে ২০টি পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এরপর ক্লোন করা হয়েছে।”

শ্যাপিরোর বক্তব্য উদ্ধৃত করে আমাদের প্রতিবেদনের জবাবে কলোসাল (Colossal) একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে তারা আবারও তাদের দাবি পুনরাবৃত্তি করে বলে, “এই পরিবর্তনগুলো করার মাধ্যমে আমরা ডায়ার উলফকে আবার ফিরিয়ে এনেছি।”

চিত্র ২.৫ : কল্পিত ডায়ার উলফ (dire wolf)-সদৃশ প্রাণীর চিত্র

তবে কলোসালে কাজ করেন—এমন ব্যক্তিদের বাইরে, নিউ সায়েন্টিস্ট (New Scientist) এমন কোনো জীববিজ্ঞানীর কথা জানে না, যিনি মনে করেন ডায়ার উলফ সত্যিই পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

নিউইয়র্কের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের (University at Buffalo, New York) ভিনসেন্ট লিঞ্চ (Vincent Lynch) বলেন, “আমার জানামতে, এই জিন পরিবর্তন করা ধূসর নেকড়েগুলোকে ডায়ার উলফ বলা যায়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক সমর্থন নেই।”

লিঞ্চসহ অন্য গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনা সম্ভব—এই বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়লে বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য যে সমর্থন প্রয়োজন, তা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তথ্যসূত্র:
Michael Le Page, 
De-extinction didn't live up to the hype, New Scientist, Volume 268, Issues 3573–3574,
2025, Pages 24-25, ISSN 0262-4079,
https://doi.org/10.1016/S0262-4079(25)02022-6.
(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407925020226)
Abstract: Biologists poured cold water on Colossal Biosciences' claim to have brought the dire wolf back

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *