
দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত আর্টেমিস–২ (Artemis II) মিশনটি শিগগিরই উৎক্ষেপণ হতে পারে।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আবার মানুষ চাঁদের দিকে যাচ্ছেন। নাসার আর্টেমিস–২ (Artemis II) মিশনটি সর্বোচ্চ এপ্রিল ২০২৬–এর মধ্যে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই মিশনে চারজন নভোচারী চাঁদের চারপাশে একবার ঘুরে আসবেন। এর মাধ্যমে আবারও চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষের পা রাখার প্রস্তুতি তৈরি হবে।
মিশনটি ২০১৯–২০২১ সালের মধ্যে উৎক্ষেপণের কথা ছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বাস্তব পরিস্থিতিতে নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় এটি বারবার দেরি হয়েছে। তবে এখন মনে হচ্ছে, অবশেষে এই অপেক্ষার শেষ হতে পারে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নাসা জানায়, স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (Space Launch System—SLS) রকেটটি “মানুষ নিয়ে উড়ার জন্য প্রস্তুত”। এরপর নভেম্বরে অরিয়ন (Orion) কুরু ক্যাপসুল (crew capsule)—নভোচারীদের বহনকারী মহাকাশযান চূড়ান্ত কিছু পরীক্ষার জন্য রকেটের ওপর বসানো হয়। এমনকি নাসা বলেছে, তারা চাইলে এপ্রিলের বদলে ফেব্রুয়ারিতেই উৎক্ষেপণ করতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এই মিশনের জন্য নির্বাচিত চারজন নভোচারী হলেন—রিড উইসম্যান (Reid Wiseman), ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover), ক্রিস্টিনা কোচ (Christina Koch) এবং জেরেমি হ্যানসেন (Jeremy Hansen)। প্রথম তিনজনই নাসার নভোচারী এবং তাঁদের প্রত্যেকেরই এর আগে একবার করে মহাকাশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। জেরেমি হ্যানসেন কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির (Canadian Space Agency) নভোচারী। এটি হবে তাঁর প্রথম মহাকাশ অভিযান।
ক্রিস্টিনা কচ (Christina Koch) বলেন, “নভোচারী হিসেবে আমরা মিশনগুলো বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকি, কারণ আমরা মানুষের মহাকাশযাত্রায় (human space flight) বিশ্বাস করি; আমরা অনুসন্ধানে (exploration) বিশ্বাস করি।” তিনি আরও বলেন, “৫০ বছরেরও বেশি সময় পর নতুনভাবে সেই ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণ করতে পারা—অর্থাৎ এমন কিছু করা যা আমরা এতদিন করিনি—এটা সত্যিই অসাধারণ।”
আর্টেমিস–২ (Artemis II) মিশনটি প্রায় ১০ দিন চলবে। শুরুতে মহাকাশযানটি দুই দিন পৃথিবীর কক্ষপথে (orbit) ঘুরবে। এরপর সেটি চাঁদের দিকে রওনা হবে। ওই প্রথম দুই দিনে নভোচারীরা জীবন–সহায়তা ব্যবস্থা (life support systems)—যা শ্বাস-প্রশ্বাস, বাতাস, পানি ইত্যাদি নিশ্চিত করে—পরীক্ষা করে দেখবেন। পাশাপাশি তাঁরা কক্ষপথে অন্য মহাকাশযানের সঙ্গে মিলিত হওয়ার একটি নিয়মপদ্ধতি (protocol)–ও পরীক্ষা করবেন। এই পরীক্ষাটি করা হবে একটি ব্যবহার হয়ে যাওয়া এবং পরে আলাদা করে ফেলে দেওয়া রকেটের অংশ (used-up and jettisoned rocket stage) ব্যবহার করে।
চিত্র ৩.২ : নাসার (NASA) আর্টেমিস-২ (Artemis II) চাঁদ মিশনের জন্য প্রস্তুত রকেট
আর্টেমিস-২ মিশনে চারজন নভোচারী অংশ নেবেন এবং তারা চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
নাসার কর্মকর্তারা জানান, এই মিশনের মাধ্যমে মহাকাশযানের জীবনধারণ ব্যবস্থা (life support systems), নেভিগেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হবে।
গবেষকদের মতে, এই মিশন সফল হলে ভবিষ্যতের আর্টেমিস-৩ (Artemis III) মিশনের মাধ্যমে মানুষকে আবার চাঁদের মাটিতে নামানো সম্ভব হতে পারে।

চিত্র ৩.৩ : নাসার আর্টেমিস-২ (Artemis II) মিশনের নভোচারী দল
প্রথম ধাপ (First steps)
এরপর অরিয়ন (Orion) ক্যাপসুলটি তার প্রধান থ্রাস্টার (main thruster—মহাকাশযানকে গতি দেওয়ার ইঞ্জিন) চালু করবে এবং চাঁদের চারপাশে আটের মতো আকৃতির (figure-of-eight) একটি পথে দ্রুত ঘুরে যাবে। এটি চাঁদের কক্ষপথে (lunar orbit) ঢুকবে না। বরং চাঁদকে একবার ঘিরে ঘুরে সরাসরি পৃথিবীর দিকে ফিরে আসবে।
চাঁদের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে ক্যাপসুলটি চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭৪০০ কিলোমিটার দূর দিয়ে যাবে। মিশনের শেষে মহাকাশযানটি প্রশান্ত মহাসাগরে (Pacific Ocean) নেমে আসবে।
এই মিশনের ধরন অনেকটাই আর্টেমিস–১ (Artemis I) মিশনের মতো। ২০২২ সালের নভেম্বরে ওই মিশনে চাঁদের চারপাশে ঘুরে এসেছিল মহাকাশযানটি। সেটি ছিল স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (Space Launch System—SLS) রকেট এবং অরিয়নের প্রথম উড়ান পরীক্ষা। তবে সেই মিশনে কোনো নভোচারী ছিলেন না।
এর পর থেকে মহাকাশযানে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা (navigation and communications systems) আরও উন্নত করা, রকেটের বাইরের অংশে অতিরিক্ত কিছু প্লেট যোগ করা যাতে কাঁপুনি (vibration) কমে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—নভোচারীদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা দিয়ে অরিয়নকে প্রস্তুত করা।
তবু এটিও একটি পরীক্ষামূলক উড়ান (test flight)। সবকিছু ঠিকঠাক হলে, এই মিশনটি ২০২৭ সালে পরিকল্পিত আর্টেমিস–৩ (Artemis III) মিশনের পথ তৈরি করবে। ওই মিশনেই নভোচারীরা ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো–১৭
(Apollo 17) মিশনের পর প্রথমবারের মতো আবার চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখবেন।
তবে এখানে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। স্পেসএক্সের স্টারশিপ (SpaceX Starship) ল্যান্ডার—যার কাজ হবে নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে নামিয়ে নেওয়া—এটি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
আর্টেমিস কর্মসূচির ধারাবাহিক সাফল্যের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। কারণ ২০৩০–এর দশক জুড়ে আরও জটিল ও বড় পরিসরের একাধিক মিশন পরিকল্পনা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো—চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষের একটি স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তোলা।
তথ্যসূত্র:
Leah Crane,
NASA aims to return astronauts to moon, New Scientist, Volume 269, Issue 3576, 2026, Page 8, ISSN 0262-4079, https://doi.org/10.1016/S0262-4079(26)00005-9.
(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407926000059)
Abstract: The oft-delayed Artemis II mission will soon have lift-off


Leave a Reply