ইইউ–এর ভেতরে সিমেন্টের মতো উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পগুলোকে এখন তাদের নিঃসরণের জন্য মূল্য দিতে হবে।
এতদিন পর্যন্ত যেসব দেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে অন্যদের থেকে পিছিয়ে ছিল, তাদের তেমন কোনো নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হয়নি—উচ্চ জ্বালানি খরচ ছাড়া। আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তিগুলো মূলত স্বেচ্ছামূলক—( voluntary অর্থাৎ মানা বাধ্যতামূলক নয়) ছিল। কিন্তু ১ জানুয়ারি থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আমদানি করা পণ্যের ওপর কার্বন শুল্ক আরোপ করছে। এই শুল্কের ফলে যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পিছিয়ে আছে, তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্বে এই ধরনের শুল্ক এটি প্রথম।
স্বাভাবিকভাবেই, যেসব দেশকে এই কার্বন কর দিতে হবে, তারা এতে সন্তুষ্ট নয়। ইইউর কার্বন বর্ডার ট্যারিফ—যাকে তারা কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (carbon border adjustment mechanism) বলে—চালু হওয়ার আগে থেকেই দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ছিল। বাণিজ্য–সংক্রান্ত বিরোধ সামনে আরও চলতে পারে। তবে জলবায়ু নীতিবিষয়ক থিংক ট্যাংক ইথ্রিজির এলি বেলটন (Ellie Belton, E3G) বলেন, এই কর ব্যবস্থা টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশ এমন ব্যবস্থা নেবে। তাঁর মতে, “বিশ্বজুড়ে নানা জায়গায় কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যবস্থা চালু হতে দেখা যাবে।” যুক্তরাজ্য ২০২৭ সালে এমন একটি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও তাইওয়ানও বিষয়টি বিবেচনা করছে।
ইইউর কার্বন বর্ডার ট্যাক্স মূলত তাদের বিদ্যমান কার্বন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থারই একটি সম্প্রসারণ। ২০০৫ সাল থেকে ইইউর যেসব শিল্প কার্বন ডাই–অক্সাইড বেশি নিঃসরণ করে, তাদের এমিশনস ট্রেডিং স্কিম
(Emissions Trading Scheme)–এর আওতায় মূল্য দিতে হয়। এখন এই স্কিম আরও বেশি উৎসের নিঃসরণ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি টন কার্বন ডাই–অক্সাইডের দাম প্রায় ৭৬ ইউরো।
এর মানে হলো—ইইউর ভেতরের ইস্পাত প্রস্তুতকারকদের খরচ সেই দেশগুলোর তুলনায় বেশি, যেখানে কার্বনের জন্য কোনো মূল্য নির্ধারণ নেই। এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যবস্থা আনা হয়েছে। অন্য কথায়, আমদানিতে যে কার্বন শুল্ক বসবে তা ইইউর ভেতরের কার্বন দামের সমপর্যায়ে রাখা হবে।
যেসব দেশ আগে থেকেই কার্বনের দাম নির্ধারণ করে, সেখান থেকে আসা ইস্পাতের ক্ষেত্রে ইইউ শুধু দুই দামের পার্থক্যটাই নেবে। ইস্পাত ছাড়াও এই বর্ডার ট্যাক্স মূলত লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, সিমেন্ট, সার, হাইড্রোজেন এবং বিদ্যুৎ—এসব খাতে প্রযোজ্য হবে।
এই নীতির তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো—ভারী শিল্পগুলো যেন দূষণের জন্য শাস্তি নেই এমন অন্য দেশে চলে না যায়। এই প্রবণতাকে বলা হয় কার্বন লিকেজ (carbon leakage—দূষণ এড়াতে শিল্পের দেশ বদলানো)। জলবায়ু নীতিবিষয়ক থিংক ট্যাংক ইথ্রিজির এলি বেলটন (Ellie Belton, E3G) বলেন, “ইইউ খুব স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা কোনো ছাড় দেবে না। কারণ ছাড় দিলে এমন জায়গা তৈরি হবে, যেখানে আরও দূষণকারী উৎপাদন গিয়ে জমা হবে।”
এর পাশাপাশি, এই নীতির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো—বিশ্ব উষ্ণতা কমাতে অন্য দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথে আরও এগোতে বাধ্য করা। বেলটনের মতে, এই ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই কাজ করতে শুরু করেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, Brazil ও Turkey–সহ কয়েকটি দেশ ইইউর কার্বন বর্ডার ট্যাক্সের কারণেই নিজেদের কার্বন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করছে।
বিভিন্ন ব্যবস্থার জটলা (A mish-mash of systems)
“আমি মনে করি, বিশ্বজুড়ে নানা জায়গায় কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যবস্থা চালু হতে দেখা যাবে।”
ইইউ ২০২৩ সালে কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। একই বছরের অক্টোবরে একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি (pilot scheme) শুরু হয়। এর আওতায় যেসব কোম্পানির ওপর এই শুল্ক প্রযোজ্য, তাদের নিঃসরণ সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হয়েছে। কোম্পানিগুলোকে ১ জানুয়ারি থেকে অর্থ পরিশোধ শুরু করতে হবে। তবে পুরো অঙ্ক একসঙ্গে নয়—ধাপে ধাপে এই শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছে, আর সম্পূর্ণ মাত্রায় তা চালু হবে ২০৩৪ সালে।
যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলোকে আপাতত এই কর দিতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে না। কারণ দেশটি ২০২৭ সালে নিজেদের একটি বর্ডার ট্যাক্স চালুর পরিকল্পনা করেছে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্যবস্থাটিকে ইইউর ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে আলোচনা চলছে।
সবচেয়ে ভালো হতো যদি কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট চালু করা সব দেশ একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করত। এতে তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ত, ফলে অন্য দেশগুলোকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করার ক্ষমতাও বেশি হতো। পাশাপাশি একই শুল্ক ব্যবস্থার আওতায় বাণিজ্য সহজ হতো এবং এই জোটে রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক খরচ কমত।
কিন্তু এলি বেলটনের মতে, বাস্তবে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের কার্বন শুল্ক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে—এক ধরনের বিভিন্ন নিয়মের জটলা।

চিত্র ৩.৪ : শিল্প কারখানার কার্বন নির্গমন জলবায়ু পরিবর্তনের বড় কারণগুলোর একটি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের এই নীতিমালা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
যেসব দেশ বেশি কার্বন নির্গমন করে পণ্য উৎপাদন করবে, তাদের রপ্তানি খরচ বেড়ে যেতে পারে। ফলে অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই নীতিমালা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে, কারণ তাদের অনেক শিল্প এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
৩.৩.১ বিভিন্ন ব্যবস্থার জটলা (A mish-mash of systems)
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কার্বন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
কিছু দেশে সরাসরি কার্বন ট্যাক্স আরোপ করা হয়, আবার কোথাও নির্গমন বাণিজ্য ব্যবস্থা (emissions trading system) ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত কার্বন নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তবে গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র:
Michael Le Page,
EU carbon border tax will force others to cut emissions,
New Scientist, Volume 269, Issue 3576,2026,
Page 9, ISSN 0262-4079,
https://doi.org/10.1016/S0262-4079(26)00006-0. (https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407926000060)


Leave a Reply