একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর আর কোনো নির্দিষ্ট সীমা থাকবে না।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বহু দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের আকার সীমিত করার কোনো কার্যকর চুক্তি থাকবে না। নিউ স্টার্ট (New START) চুক্তি সত্যিই বিশ্বকে কতটা নিরাপদ করেছে—এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত: এর বিকল্প কোনো নতুন চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া প্রথমবার তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর সীমা আরোপে একমত হয় ১৯৯১ সালে, স্টার্ট–১ (START I) চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তির আওতায় একে অন্যের অস্ত্রভাণ্ডার পরিদর্শনের সুযোগও ছিল। পরে ২০১১ সালে এটি নিউ স্টার্ট দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। ২০২১ সালে Joe Biden এবং Vladimir Putin চুক্তিটির মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়াতে সম্মত হন। কিন্তু এখন এটি ৫ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছে, আর বিকল্প চুক্তি নিয়ে আলোচনা কার্যত থেমে গেছে।
এর মধ্যেই রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে—বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালানোর পর। এর কয়েক মাসের মধ্যেই রাশিয়া অস্ত্র পরিদর্শন থেকে সরে দাঁড়ায়, আর যুক্তরাষ্ট্রও একই পদক্ষেপ নেয়। এখন দুই দেশ থেকেই আবার পারমাণবিক পরীক্ষা শুরু করার কথা শোনা যাচ্ছে—যা মূলত শক্তি প্রদর্শনের মতো একটি আক্রমণাত্মক আচরণ, বাস্তবে যার তেমন কোনো অর্থ নেই। সব মিলিয়ে, নিউ স্টার্ট–এর বিকল্প কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম বলে মনে হচ্ছে।
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক বেল (Mark Bell, University of Minnesota) বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রসংখ্যাকে রাশিয়ার কাছাকাছি কোনো সংখ্যায় বেঁধে দেওয়ার (cap) মতো নতুন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, তাকে একসঙ্গে রাশিয়া ও চীন—দু’দেশকেই ঠেকানোর (deter) মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র রাখতে হবে। চীনের কাছে এখন প্রায় ৬০০টি পারমাণবিক অস্ত্র আছে—যা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার (প্রতিটি দেশের) ৫০০০–এর বেশি অস্ত্রের তুলনায় অনেক কম। তবে চীন দ্রুতগতিতে তার অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, রাশিয়াও এই যুক্তির ভিত্তিতে এমন কোনো সীমা মেনে নিতে চাইবে না, যেখানে তার অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কম রাখতে বলা হবে। আর চীনও এমন নতুন চুক্তিতে সহজে রাজি হবে না, যদি সেই চুক্তিতে তাদের অস্ত্র বর্তমান সংখ্যাতেই আটকে যায়। কারণ এতে ভবিষ্যতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমপর্যায়ে (parity) পৌঁছানোর সুযোগ বাধাগ্রস্ত হবে। বেল বলেন, চুক্তি করা কখনোই সহজ নয়, আর শুরুটাই এখানে বেশ জটিল।

চিত্র ৩.৪ : মস্কোর সামরিক কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র
স্টার্ট–১ (START I) এবং নিউ স্টার্ট (New START) চুক্তিকে মোটের ওপর সফল বলেই ধরা হয়। এগুলো নিখুঁত নয়, কিন্তু বাস্তবসম্মত (pragmatic) এবং স্থিতিশীলতা (stabilising) বজায় রাখতে সহায়ক ছিল। তবে বেল সন্দিহান—এসব চুক্তি সত্যিই পৃথিবীকে কতটা নিরাপদ করেছে। তিনি বলেন, “এগুলো কি দুই পরাশক্তির কিছুটা টাকা বাঁচিয়েছে? হতে পারে। সহযোগিতার জন্য কি একটি কার্যকর আলোচনার জায়গা (forum) দিয়েছে? হ্যাঁ। কিন্তু যুদ্ধের সম্ভাবনা কি একেবারে বদলে দিয়েছে? আমার মনে হয় না।”
বেল বলেন, চুক্তি থাকুক বা না থাকুক, পারমাণবিক যুদ্ধের বাস্তব ঝুঁকি সবসময়ই থাকবে। বিভিন্ন দিক থেকে দেখলে, পরমাণু বিভাজন (atom has been split) হয়ে যাওয়ার পর পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের শঙ্কা—যাকে বলা হয় মিউচুয়ালি অ্যাশিউর্ড ডেস্ট্রাকশন (mutually assured destruction)—এখন আমাদের সবচেয়ে বড় বীমা বা নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করছে। তাঁর মতে, যুদ্ধ ঠেকায় মূলত পারমাণবিক সংঘাতের অকল্পনীয় পরিণতির ভয়; চুক্তি নয়। তিনি বলেন, “স্থিতিশীলতার প্রভাবটা আসে এই বিপদ থেকেই, আর সেটা আপনি সরাতে পারবেন না। পারমাণবিক প্রতিরোধ (nuclear deterrence) ব্যবস্থায় এটা ত্রুটি নয়—এটাই বৈশিষ্ট্য।”
তবে যাঁদের ভেতরের (insider) কাজের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের কেউ কেউ চুক্তি শেষ হওয়া নিয়ে আরও বেশি উদ্বিগ্ন। স্টিফেন হার্জগ (Stephen Herzog) ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরের মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে (Middlebury Institute of International Studies, Monterey, California) একজন গবেষক। এর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরে (US Department of Energy) অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ (arms control)–সংক্রান্ত কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি নিউ সায়েন্টিস্ট–কে বলেছেন, নিউ স্টার্ট (New START) শেষ হয়ে গেলে পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
হার্জগ বলেন, “এই চুক্তি না থাকলে বিশ্ব আরও কম নিরাপদ হয়ে পড়ে। কারণ তখন দেশগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা থাকে না।” তিনি বলেন, “এতে এমন নেতাদের হাতে বাড়তি সুযোগ তৈরি হয়, যারা পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভর করতে চায়।” হার্জগ আরও বলেন, “যে পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ কার্যক্রম কী হবে তা ক্রমেই অনুমান করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, আর একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তও আগেভাগে বোঝা যাচ্ছে না—সে অবস্থায় অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমিয়ে রাখে এমন কোনো আস্থা তৈরির ব্যবস্থা না থাকাটা সত্যিই ভয়ংকর।”
সমস্যা আপাতত এড়িয়ে যাওয়া (Kicking the can down the road)
এখনো পারমাণবিক অস্ত্র–সংক্রান্ত কিছু চুক্তি আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলো পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (Treaty on the Prohibition of Nuclear Weapons)। এর লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্র পুরোপুরি তুলে দেওয়া। অনেক দেশ এতে স্বাক্ষর করছে, তবে উল্লেখযোগ্যভাবে—পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো এতে যোগ দেয়নি।
আরও একটি চুক্তি হলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (Treaty on the Non-Proliferation of Nuclear Weapons)। এতে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক দেশ সই করেছে। কিন্তু এই চুক্তি কার্যত অস্ত্রের মোট সংখ্যা খুব একটা কমাতে পারেনি। বাস্তবে, পারমাণবিক পরাশক্তিগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার কাজটি সত্যিকার অর্থে করেছিল শুধু নিউ স্টার্ট (New START) চুক্তিই।
স্টিফেন হার্জগের মতে, যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন রাজি হতেন, তাহলে তারা এখনই প্রায় একই ধরনের একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে পারতেন। এমনকি পুতিনের পক্ষ থেকে এক বছরের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছিল, যা ট্রাম্প ইতিবাচকভাবেই নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে কোনো আলোচনা শুরু হয়নি। আর এমন কোনো চুক্তি হলেও, সেটি সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে সাময়িক সমাধানই হতো।
মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ফিলিপ ব্লিক (Philipp Bleek) বলেন, যদি এই অতিরিক্ত সময়টা নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনার কাজে লাগানো হতো, তাহলে এক বছরের মেয়াদ বাড়ানো কিছুটা কাজে আসতে পারত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা এখন বেশ দুর্বল। ব্লিকের ভাষায়,
“এক বছরের মেয়াদ বাড়ালে রাশিয়ার মনে হতে পারে তারা শুধু সমস্যাটা ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে তারা আলোচনায় বসতে আরও অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।”
হার্জগ বলেন, পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা (treaty negotiations) খুব জটিল ও টানাপোড়েনের বিষয়। এতে রাজনীতিবিদ, সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা—সবাই জড়িত থাকে। আর চুক্তির ছোট ছোট অংশের ভেতরেও (small print) এমন কিছু শর্ত ঢোকানোর সুযোগ থাকে, যা দেখতে ছোট হলেও কৌশলগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিতে পারে।
হার্জগের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মী—যেমন অস্ত্র পরিদর্শক (weapons inspectors), আলোচক (negotiators) এবং পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ—চাকরি হারিয়েছেন, ছাঁটাই হয়েছেন, বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এতে রাশিয়া বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
হার্জগ বলেন, “আমরা যদি সত্যিই নতুন একটি চুক্তি নিয়ে কঠোরভাবে আলোচনা শুরু করি, তাহলে কিছু কাজ করার মতো পর্যাপ্ত লোকবল ও দক্ষ জনবল আমাদের কাছে নাও থাকতে পারে।”
তথ্যসূত্র:
Matthew Sparkes,
Russia-US nuclear pact set to end,
New Scientist,
Volume 269, Issue 3576,
2026,
Pages 10-11,
ISSN 0262-4079,
https://doi.org/10.1016/S0262-4079(26)00007-2.
(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407926000072)
Abstract: The expiry of a key treaty means there will be no cap on US and Russian nuclear weapons


Leave a Reply