সমুদ্রের পানি পানযোগ্য পানিতে রূপান্তর করা এতটাই ব্যয়বহুল এবং শক্তি–নির্ভর যে, বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গায় এটি বাস্তবসম্মত নয়। তবে নরওয়ের একটি কোম্পানি এমন একটি নতুন পদ্ধতি পরীক্ষা করছে, যা এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। ফ্লোসিয়ান (Flocean) এ বছর বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পর্যায়ের সমুদ্রের নিচে বসানো লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র চালু করতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তাদের এই ব্যবস্থা প্রক্রিয়াটির খরচ ও শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে দেবে।
বিশ্বজুড়ে পানির চাহিদা বাড়ছে। এর পেছনে আছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ডেটা সেন্টার ও উৎপাদন শিল্পের মতো শিল্পকারখানার ব্যবহার। অন্যদিকে, খরা, বন উজাড় এবং অতিরিক্ত সেচের কারণে মিঠা পানির প্রাপ্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
ভূমিভিত্তিক লবণমুক্তকরণ (land-based desalination) এখন বিশ্বের মোট মিঠা পানির সরবরাহের প্রায় ১ শতাংশ তৈরি করে। ৩০ কোটির বেশি মানুষ তাদের দৈনন্দিন পানির চাহিদার জন্য এই উৎসের ওপর নির্ভর করে। সবচেয়ে বড় কেন্দ্রগুলো রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে—কারণ সেখানে শক্তি তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ায় কাজটা করা বেশি সম্ভব, আর পানির সংকট বেশি হওয়ায় এটা আরও প্রয়োজনীয়।
আজ লবণমুক্তকরণের সবচেয়ে প্রচলিত প্রযুক্তি হলো রিভার্স অসমোসিস (reverse osmosis)। এতে সমুদ্রের পানিকে একটি ঝিল্লি (membrane) দিয়ে পাম্প করে পাঠানো হয়। এই ঝিল্লিতে অণুবীক্ষণিক ছিদ্র থাকে, যেগুলো দিয়ে শুধু পানির অণু (water molecules) যেতে পারে। ফলে লবণ ও অন্যান্য অশুদ্ধ পদার্থ (impurities) ছেঁকে বের হয়ে যায়। তবে পানি ফিল্টারের ভেতর দিয়ে ঠেলে পাঠাতে পানিকে অনেক চাপ (pressurised) দিতে হয়, আর এতে বিপুল পরিমাণ শক্তি লাগে।
ফ্লোসিয়ান (Flocean)-এর পদ্ধতি হলো সমুদ্রের অনেক গভীরে পানিছাঁকনি পড (water-filtering pods) নামানো। গভীরতায় সমুদ্রের পানি থেকে লবণ আলাদা করে, তারপর মিঠা পানি আবার পাম্প করে স্থলে তুলে আনা। রিভার্স অসমোসিস পডগুলো গভীর পানির নিচে বসানোর ফলে এই প্রযুক্তি হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ (hydrostatic pressure) কাজে লাগায়—অর্থাৎ ওপরের সব পানির ওজন নিচের দিকে চাপ তৈরি করে—এবং সেই চাপই সমুদ্রের পানিকে ফিল্টার ঝিল্লির ভেতর দিয়ে ঠেলে দেয়।কোম্পানিটির মতে, কম পাম্পিং মানেই কম শক্তি খরচ। তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলোর তুলনায় শক্তি ব্যবহার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে যায়।এ ছাড়া, পানির ওপরের যে অংশে সূর্যের আলো পৌঁছায় (sunlight zone), তার নিচে গেলে সমুদ্রের পানি তুলনামূলকভাবে বেশি পরিষ্কার থাকে। এই sunlight zone পানির পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই পানি ঝিল্লিতে (membranes) পৌঁছানোর আগে আগের মতো বেশি পূর্বপ্রস্তুতি (pretreatment) দরকার হয় না।

চিত্র ৩.৭ : Flocan One প্রযুক্তি সমুদ্রের নিচে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে
“প্রক্রিয়া ও প্রকৌশলের দিক থেকে নিচে পরিস্থিতিটা আসলে বেশ একঘেয়ে,” বলেন আলেকজান্ডার ফুগলেসাং (Alexander Fuglesang)—ফ্লোসিয়ান (Flocean)–এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO)। তিনি বলেন, “সব জায়গায় একই লবণাক্ততা, একই তাপমাত্রা ও একই চাপ থাকে। চারপাশ অন্ধকার। আর এমন ব্যাকটেরিয়াও খুব কম থাকে, যেগুলো বায়োফাউলিং (biofouling—যন্ত্রের গায়ে জীবাণু জমে সমস্যা তৈরি করা) ঘটাতে পারে।” পানিকে ঝিল্লির ভেতর দিয়ে ঠেলে দেওয়ার যে হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ (hydrostatic pressure) কাজ করে, সেটিই আবার লবণাক্ত বর্জ্য পানি বা ব্রাইন (brine) ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। ফ্লোসিয়ানের মতে, এই ব্রাইনে এমন কোনো রাসায়নিক নেই, যা সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি করতে পারে।
গত এক বছর ধরে ফ্লোসিয়ান নরওয়ের সবচেয়ে বড় সমুদ্রভিত্তিক সরবরাহ কেন্দ্র (offshore supply base)—যা উপকূলের বাইরে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত এলাকায় অবস্থিত— মংস্টাড ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক (Mongstad Industrial Park)–এ তাদের পরীক্ষাকেন্দ্রে ৫২৪ মিটার গভীরতায় পানি লবণমুক্ত করছে। একই জায়গায় তাদের বাণিজ্যিক কেন্দ্র ফ্লোসিয়ান ওয়ান (Flocean One) নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি চালু হলে প্রথমে প্রতিদিন ১০০০ ঘনমিটার মিঠা পানি উৎপাদন করবে। এরপর আরও পড (pod—পানি ছেঁকে লবণ আলাদা করার ছোট স্বতন্ত্র ইউনিট) যোগ করে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো যাবে।
“আমাদের নীতি হলো সমুদ্রের নিচের ইউনিটগুলো একই রকম রাখা, আর ক্রমেই বড় যন্ত্র বানানোর বদলে সংখ্যা বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানো,” বলেন ফুগলেসাং। তবে এভাবে উৎপাদন বাড়াতে গেলে পুরো ব্যবস্থার বিভিন্ন্য পর্যায়ে কিছু প্রকৌশলগত সমন্বয় করতে হবে। কারণ তখন একাধিক মডিউল একই বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তাই ফ্লোসিয়ানের প্রকৌশলীদের বিদ্যুৎ বণ্টন এবং পারমিয়েট ম্যানিফোল্ড (permeate manifold—একাধিক ঝিল্লি থেকে বিশুদ্ধ পানি একটিমাত্র পথে আনার ব্যবস্থা) এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে উৎপাদন বাড়ানো যতটা সম্ভব সহজ হয়।
বড় পরিসরের পথে
“খরচ কমানো গেলে এবং উপযুক্ত জায়গায় এটি বসানো হলে, এই সমাধানটি কার্যকর হতে পারে এবং সাশ্রয়ী দামে পানি সরবরাহ করতে পারবে। তবে বড় পরিসরে এটি এখনো প্রমাণিত হয়নি,” বলেন নিদাল হিলাল (Nidal Hilal), নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবি (New York University Abu Dhabi)–এর গবেষক।
হিলাল বলেন, প্রযুক্তিটিকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার জন্য খরচ কমানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখনো প্রচলিত উপায়ে মিঠা পানি সংগ্রহের তুলনায় এটি অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
ঝিল্লি (membranes) পরিষ্কার করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করাই হবে ফ্লোসিয়ানের সবচেয়ে বড় খরচগুলোর একটি। তবে ঝিল্লি প্রযুক্তির উন্নতি এতে সহায়তা করতে পারে। হিলালের গবেষণা দল এমন বিদ্যুৎ পরিবাহী ঝিল্লি (electrically conductive membranes) নিয়ে কাজ করছে, যেগুলো বিদ্যুৎ ব্যবহার করে লবণের আয়ন (salt ions) ও ময়লা জমার উপাদান (foulants) দূরে সরিয়ে রাখে। এতে ঝিল্লি নিজে নিজেই পরিষ্কার থাকে এবং পানি ছাঁকার গতি বাড়ে।
ফ্লোসিয়ান ওয়ান (Flocean One) চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মিঠা পানি উৎপাদন শুরু করার কথা। প্রযুক্তিটি যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে, তাহলে বিশ্বের অন্য জায়গায় আরও বড় কেন্দ্র গড়ার জন্য ফ্লোসিয়ান প্রয়োজনীয় সমর্থন পেতে পারে।
১% - বিশ্বের মোট মিঠা পানির কত অংশ ভূমিভিত্তিক লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র থেকে আসে
৫০% - প্রচলিত কেন্দ্রের তুলনায় ফ্লোসিয়ানের সমুদ্রের নিচের কেন্দ্র কত কম শক্তি ব্যবহার করতে পারে
ঝিল্লি (membranes) পরীক্ষার করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করাই হবে ফিউশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তবে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এটি সমাধান করা সম্ভব হবে। বর্তমানে গবেষণা চলছে বৈদ্যুতিক পরিবাহী ঝিল্লি (electrically conductive membranes) নিয়ে, যেগুলো বিদ্যুৎ ব্যবহার করে লবণের আয়ন (salt ions) ও অন্যান্য ছোট অণুগুলো (molecules) পানির মধ্য থেকে ঝিল্লির নিচে নিয়ে যেতে পারে এবং পানি চক্রের গতি বাড়াতে সক্ষম। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যদি প্রযুক্তিটি সঠিকভাবে কাজ করে, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও আরও বড় কেন্দ্র গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়া যেতে পারে।
তথ্যসূত্র:
Vanessa Bates Ramirez,
World's first subsea desalination facility will provide drinking water,
New Scientist,
Volume 269, Issue 3576,
2026,
Page 13,
ISSN 0262-4079,
https://doi.org/10.1016/S0262-4079(26)00010-2.
(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407926000102)

Leave a Reply