এ বছর হওয়া গবেষণাগুলো থেকে বোঝা যেতে পারে, এই ওষুধটি ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব কি না।
দুটি বড় আকারের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা (trial) এ বছর শেষ হওয়ার কথা। এই পরীক্ষাগুলোতে সাইকেডেলিক (psychedelic) ওষুধ এলএসডি (LSD) উদ্বেগ (anxiety) কমাতে কতটা কাজে লাগে, তা দেখা হচ্ছে। আগের ধাপের একটি পরীক্ষায় এই ওষুধ ভালো ফল দেখিয়েছে। তাই বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে (US) ২০২৭ সালের মধ্যেই এই চিকিৎসা পাওয়া যেতে পারে।
সাধারণ উদ্বেগজনিত ব্যাধি (generalised anxiety disorder) একটি প্রচলিত সমস্যা। এতে মানুষ অনেক রকম বিষয় নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগ অনুভব করে। সাধারণত এটির চিকিৎসায় বিষণ্নতার ওষুধ (antidepressants) এবং কথা বলাভিত্তিক থেরাপি (talking therapies) ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রায় অর্ধেক মানুষ এসব চিকিৎসায় সাড়া দেয় না।
সাইলোসাইবিন (psilocybin) এবং এমডিএমএ (MDMA)-এর মতো অন্য কিছু সাইকেডেলিক ওষুধ কিছু দেশে খুব গুরুতর বিষণ্নতা (depression) এবং মানসিক আঘাত-পরবর্তী চাপজনিত ব্যাধি (post-traumatic stress disorder)-এর চিকিৎসায় ইতিমধ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে আছে অস্ট্রেলিয়া (Australia) ও সুইজারল্যান্ড (Switzerland)। এলএসডি (LSD) এখন ক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা হিসেবে বেশি করে গবেষণায় আসছে। আংশিক কারণ হলো—গবেষণায় দেখা যায়, কিছু মানুষের মধ্যে এটি গভীর আবেগগত অভিজ্ঞতা (এটা ভালোও হতে পারে, অস্বস্তিকর/ভারীও হতে পারে—মানে ইমোশনালভাবে খুব শক্তিশালী অভিজ্ঞতা।) তৈরি করে। আর এটি মস্তিষ্কের নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে পারে। এতে নতুন চিন্তার ধারা তৈরি হতে সাহায্য হতে পারে।
২০২৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দেখিয়েছে, এলএসডি -এর একবারে একটি উচ্চ মাত্রার ডোজ মাঝারি থেকে গুরুতর উদ্বেগ অন্তত তিন মাসের জন্য কমিয়েছে। এখন পরের ধাপের দুটি পরীক্ষা এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এগোচ্ছে। এ বছরই সেগুলোর ফল পাওয়া যেতে পারে। দুই পরীক্ষাতেই মাঝারি থেকে গুরুতর উদ্বেগ আছে—এমন প্রায় ২০০ জন করে অংশগ্রহণকারী আছে। তারা কেউ এলএসডি (LSD) ট্যাবলেট খাবে, আর কেউ প্লাসিবো (placebo) বড়ি খাবে—প্লাসিবো মানে এমন বড়ি, যা দেখতে আসল ওষুধের মতো, কিন্তু এতে আসল ওষুধের সক্রিয় উপাদান থাকে না।
এলএসডি ট্যাবলেটগুলোর মোট মাত্রা হবে ১০০ মাইক্রোগ্রাম । ডোজ নেওয়ার দিন থেকে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত তাদের উদ্বেগের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর গবেষণার দ্বিতীয় ধাপে ১০ মাসের একটি পর্ব থাকবে। এতে সব অংশগ্রহণকারীকে—যারা শুরুতে প্লাসিবো খেয়েছিল তারাও—এলএসডি (LSD) দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে। শর্ত হলো, তারা যখন একটি মানদণ্ড স্কেলে নিজেদের উদ্বেগ একটি নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছেছে বলে জানাবে, তখনই।
এতে একবারের ডোজের প্রভাব কত দিন থাকে, তা বোঝা যাবে—বলছেন নিউ ইয়র্কের (New York) বায়োটেক কোম্পানি মাইন্ডমেড (MindMed)-এর ড্যান কারলিন (Dan Karlin)। তিনি ২০২৫ সালের পরীক্ষায় এবং আসন্ন দুই পরীক্ষাতেই যুক্ত ছিলেন।
দুটি পরীক্ষার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো—দ্বিতীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের একটি তৃতীয় দলও আছে। এই দলের জন্য এলএসডি (LSD)-এর ৫০ মাইক্রোগ্রাম (microgram) ডোজ রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ডোজ মনোভাব-ধারণায় পরিবর্তন (mind-altering effects) ঘটাতে পারে, যেমন বাস্তবতাবোধে বিভ্রান্তি (hallucinations)। তবে প্লাসিবো (placebo) প্রভাবের চেয়ে বেশি উদ্বেগ কমায় না। এই তৃতীয় দল রাখলে সাইকেডেলিক (psychedelic) গবেষণার একটি বড় সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করা যাবে। কারণ অনেক সময় অংশগ্রহণকারীরা বুঝে ফেলতে পারেন তারা আসল ওষুধ নিয়েছেন কি না।

চিত্র ৩.৬ : এলএসডি (LSD) নিয়ে গবেষণায় মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে
তৃতীয় দলের অংশগ্রহণকারীরা বুঝে যেতে পারেন যে তারা এলএসডি (LSD) নিয়েছেন। কিন্তু তারা জানবেন না, সেটি উদ্বেগ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডোজ ছিল কি না। মেরিল্যান্ডের (Maryland) জনস হপকিনস বেইভিউ মেডিক্যাল সেন্টার (Johns Hopkins Bayview Medical Center)-এর সন্দীপ নায়েক (Sandeep Nayak) বলেন, এতে প্লাসিবো প্রভাবকে আলাদা করে বোঝা সহজ হবে। তিনি এই পরীক্ষাগুলোতে যুক্ত নন।
করলিন বলেন, দুই পরীক্ষাই যদি ভালো ফল দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে (US) ২০২৭ সালের মধ্যেই ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) উদ্বেগ চিকিৎসায় এলএসডি (LSD) অনুমোদন দিতে পারে। এতে ইউরোপসহ অন্য জায়গাতেও অনুমোদনের পথ তৈরি হতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (Stanford University) বরিস হেইফেটস (Boris Heifets) বলেন, “পরের পরীক্ষাগুলো যদি আগেরটার (২০২৫) কাছাকাছিও ফল দেয়, তাহলে সেটাই এফডিএ (FDA)-এর জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।”
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
সাধারণত, দলের ব্যবহৃত উদ্বেগ স্কেল (anxiety scale)–এ প্লাসিবো (placebo) গ্রুপ ও সাইকেডেলিক (psychedelic) গ্রুপের মধ্যে ৩ থেকে ৫ পয়েন্ট পার্থক্য থাকলেই সেটাকে মানুষের জীবনে অর্থপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধরা হয়—বলেছেন নায়েক । ২০২৫ সালের ট্রায়ালে প্রায় ৫ পয়েন্ট পার্থক্য দেখা গিয়েছিল। তাই পরের ট্রায়ালগুলোতেও এই সীমা (threshold) ছুঁয়ে ফেলার ভালো সম্ভাবনা আছে। তবে তিনি বলেন, যেকোনো উপকারিতা কতদিন থাকে এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি না—এসবের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে, যদি এই চিকিৎসায় সাময়িক মানসিক অস্বস্তি হয়, তাহলে এফডিএ (FDA) সেটাকে সহনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে মানতে পারে—বলেছেন নায়েক। কিন্তু যদি এই অস্বস্তি দীর্ঘদিন থাকে, তাহলে সম্ভবত তারা সেটাকে সহনীয় বলবে না। তবে ২০২৫ সালের পরীক্ষায় এমন দীর্ঘমেয়াদি অস্বস্তি দেখা যায়নি।
তবু এই পদ্ধতি অনুমোদন পেলেও, উদ্বেগ কমাতে LSD সবার জন্য সহজে পাওয়া যেতে কয়েক বছর লাগতে পারে—বলেছেন নায়েক। আর সম্ভবত এটি ব্যবহার করা হবে শুধু তখনই, যখন প্রচলিত চিকিৎসাগুলো কাজ করবে না। কারণ, ব্যবহারিক কিছু সমস্যা আছে। যেমন, LSD নেওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা ধরে রোগীকে চিকিৎসকের নজরদারিতে রাখতে হয়।
তথ্যসূত্র:
Carissa Wong,
We'll learn more about LSD and anxiety,
New Scientist,
Volume 269, Issue 3576,
2026,
Page 12,
ISSN 0262-4079,
https://doi.org/10.1016/S0262-4079(26)00009-6.
(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407926000096)
Abstract: Studies this year could lead to the drug being used as a mental health treatment


Leave a Reply