চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)—ওপেনএআইয়ের (OpenAI) তৈরি একটি জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট—উন্মুক্ত হওয়ার পরের তিন বছরে আমাদের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন এসেছে। তবে একটি ক্ষেত্র এখনো তেমন বদলায়নি—অথবা অন্তত আগের নিয়ম ধরে রাখার চেষ্টা করছে—আর তা হলো কপিরাইট আইন মানা।
এটা আর গোপন বিষয় নয় যে শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলো তাদের মডেল তৈরি করেছে ইন্টারনেট থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে। এর মধ্যে অনুমতি ছাড়াই নেওয়া কপিরাইটযুক্ত উপকরণও ছিল। এ বছর বড় বড় কপিরাইট মালিকরা এর জবাব দেয়। তারা কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে এআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করে।
সবচেয়ে আলোচিত মামলাটি জুন মাসে করে ডিজনি (Disney) ও ইউনিভার্সাল (Universal)। তারা অভিযোগ করে, এআই ছবি তৈরির সিস্টেম মিডজার্নি (Midjourney) তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (intellectual property—সৃষ্টিশীল কাজের ওপর আইনগত মালিকানা) ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা এমন ছবি তৈরি করতে পারছে, যেখানে ডিজনি ও ইউনিভার্সালের পরিচিত চরিত্রগুলো স্পষ্টভাবে নকল করা হয়েছে।
এই মামলাটি এখনো চলমান। আগস্ট মাসে মিডজার্নি (Midjourney) এর জবাবে বলে, “কপিরাইট যে সীমিত একচেটিয়া অধিকার দেয়, তা ‘ফেয়ার ইউজ’ (fair use ন্যায্য ব্যবহার)–এর জায়গা করে দিতে হবে।” তাদের যুক্তি হলো, এআই কোম্পানিগুলো কপিরাইটযুক্ত কাজ ব্যবহার করে তাদের মডেল প্রশিক্ষণ দিতে পারে, কারণ এর ফলাফল রূপান্তরধর্মী (transformative)অর্থাৎ এতটাই আলাদা যে কপিরাইট ভাঙার মধ্যে পড়ে না।
মিডজার্নির এই কড়া বক্তব্য দেখায়, কপিরাইট নিয়ে বিতর্কটি প্রথমে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা সহজ নয়। যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Sussex) আন্দ্রেস গুয়াদামুজ (Andres Guadamuz) বলেন, “অনেকে ভেবেছিলেন কপিরাইটই হবে সেই চূড়ান্ত অস্ত্র, যা এআইকে থামিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সেভাবে ঘটছে না।”
গুয়াদামুজ আরও বলেন, তিনি অবাক হয়েছেন এ দেখে যে কপিরাইট আইন এআই কোম্পানিগুলোর অগ্রগতিতে খুব বেশি বাধা তৈরি করতে পারছে না।

চিত্র ২.১০ : বিভিন্ন অভিযোগের পর এআই-তৈরি কনটেন্ট নিয়ে কপিরাইট বিতর্ক তীব্র হয়েছে
সরকারের হস্তক্ষেপ
তবু কিছু সরকার এই বিতর্কে এগিয়ে আসে। অক্টোবরে জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ওপেনএআইকে (OpenAI) অনুরোধ জানায়—সোরা ২ (Sora 2) নামের এআই ভিডিও তৈরির সিস্টেমটির মাধ্যমে যেন দেশটির সাংস্কৃতিক কপিরাইট সম্মান করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাঙ্গা (manga—জাপানি কমিক্স) এবং নিনটেনডো (Nintendo) প্রকাশিত জনপ্রিয় ভিডিও গেমগুলোর মতো সৃষ্টিশীল কাজ।
বাস্তব মানুষের মতো দেখতে ভিডিও তৈরি করার ক্ষমতার কারণেও সোরা ২ নতুন করে বিতর্কে জড়ায়। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের (Martin Luther King Jr) উত্তরাধিকার রক্ষাকারীদের অভিযোগের পর ওপেনএআই তার নীতিমালা আরও কঠোর করে। তাদের অভিযোগ ছিল, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এই নেতাকে তার বিখ্যাত “আই হ্যাভ আ ড্রিম” (I have a dream) ভাষণের নকল দৃশ্যে দেখানো হয়েছে, যার একটি ক্ষেত্রে তাকে বানরের মতো শব্দ করতে দেখা যায়।
একটি বিবৃতিতে ওপেনএআই (OpenAI) জানায়, “ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের দেখানোর ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। তবে ওপেনএআই মনে করে, জনপরিচিত ব্যক্তিরা এবং তাদের পরিবার শেষ পর্যন্ত তাদের চেহারা বা অবয়ব কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার অধিকার রাখে।”
তবে এই অবস্থান বদল পুরোপুরি ছিল না। কোনো সেলিব্রিটি বা জনপরিচিত ব্যক্তি যদি চান না যে তাদের ছবি সোরা ২ (Sora 2)–এ ব্যবহার করা হোক, তাহলে তাদের নিজেকেই ‘অপ্ট আউট’ করতে হয়। অনেকের মতে, এই নিয়ম খুব বেশি ছাড় দেওয়া। সাবেক এআই নির্বাহী এবং ‘ফেয়ারলি ট্রেইন্ড’ (Fairly Trained) নামের একটি প্রচারণা গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা এড নিউটন–রেক্স (Ed Newton-Rex) বলেন, “কেউই যেন ওপেনএআইকে আলাদা করে বলতে বাধ্য না হয় যে তারা বা তাদের পরিবার ডিপফেক (deepfake—কৃত্রিমভাবে তৈরি ভুয়া ছবি বা ভিডিও) হতে চায় না।”
কিছু ক্ষেত্রে এআই কোম্পানিগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য আইনি সমস্যার মুখেও পড়েছে। গত বছরের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য মামলাগুলোর একটি এর উদাহরণ। সেপ্টেম্বর মাসে তিনজন লেখক অভিযোগ করেন, ক্লড (Claude) চ্যাটবট তৈরি করা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক (Anthropic) ইচ্ছাকৃতভাবে ৭০ লাখের বেশি পাইরেটেড বই ডাউনলোড করেছে, যাতে সেগুলো দিয়ে তাদের এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়।
মামলাটি পর্যালোচনা করা একজন বিচারক মনে করেন, যদি প্রতিষ্ঠানটি এই উপকরণগুলো এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সেটি নিজে থেকেই কপিরাইট ভাঙা বলে গণ্য হবে না। কারণ এই ধরনের প্রশিক্ষণকে যথেষ্ট রূপান্তরধর্মী ব্যবহার (transformative use—মূল কাজ থেকে আলাদা নতুন কিছু তৈরি করা) হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে বই পাইরেসির (piracy—অবৈধভাবে
কপি বা ডাউনলোড করা অভিযোগটি এতটাই গুরুতর ছিল যে, সেটি আদালতে বিচার পর্যন্ত যেতে পারত।
কিন্তু সেই পথে না গিয়ে অ্যানথ্রপিক (Anthropic) মামলাটি মীমাংসা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর জন্য প্রতিষ্ঠানটি ন্যূনতম ১.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধে রাজি হয়।
আন্দ্রেস গুয়াদামুজ (Guadamuz) বলেন, “এখান থেকে বোঝা যায়, এআই কোম্পানিগুলো আগেই হিসাব করে নিয়েছে। তারা সম্ভবত ক্ষতিপূরণমূলক সমঝোতা এবং কৌশলগত লাইসেন্স চুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে বিষয়গুলো সামাল দেবে।” তিনি আরও বলেন, “কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলার কারণে খুব অল্প কয়েকটি কোম্পানিই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। এআই প্রযুক্তি থাকছেই, যদিও বর্তমান অনেক কোম্পানি মামলা বা বাজারের অতিরিক্ত ফোলাভাবের (bubble) কারণে টিকে নাও থাকতে পারে।”
তথ্যসূত্র:
Chris Stokel-Walker,
AI firms felt the wrath of copyright holders,
New Scientist,Volume 268, Issues 3573–3574,
2025, Page 29, ISSN 0262-4079,
https://doi.org/10.1016/S0262-4079(25)02027-5.
(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0262407925020275)
Abstract: How media companies tried to wrestle back control of their characters from AI models.
"G:\My Drive\personal\gobeshona\2026\gobeshona_2026\2026_01_03_New_Scientist_International_Edition_-_No.3576,_3_January_2026.pdf"
2026_01_03_New_Scientist_International_Edition_-_No.35756,_3_January_2026

Leave a Reply